স্কাউটিং বিশ্বব্যাপী একটি অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষামূলক যুব আন্দোলন। যা যুবকদের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের মাধ্যমে সৎ, কর্মঠ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। বাংলাদেশে এটি একটি সুসংগঠিত আন্দোলন, যার মাধ্যমে তরুণরা সেবামূলক কাজের প্রশিক্ষণ পায়।
২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্কাউট দিবস। স্কাউটিং আন্দোলনের প্রবক্তা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২২ ফেব্রুয়ারি জন্ম জন্মগ্রহণ করেন। তারই হাত ধরে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে স্কাউটিং আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তাই ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী স্কাউট দিবস হিসেবে পালিত হয়। তার পুরো নাম রবার্ট ষ্টিফেনশন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল। ব্যাডেন পাওয়েল বা বিপি নামে তিনি সর্বোধিক পরিচিত। অনেক দেশে দিনটি প্রতিষ্ঠাতা ব্যাডেন পাওয়েলের সংক্ষিপ্ত নামানুসারে বিপি দিবস হিসেবে পরিচিত। বিশ্ব স্কাউট দিবস বা প্রতিষ্ঠাতা দিবস প্রতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়, যা স্কাউটিং আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল এবং তাঁর স্ত্রী ওলভে ব্যাডেন পাওয়েল-এর জন্মদিন। এটি স্কাউটদের প্রতিশ্রুতি নবায়ন এবং তরুণদের সেবা ও শৃঙ্খলাবোধে অনুপ্রাণিত করার দিন। এছাড়াও, প্রতি বছর ১ আগস্ট বিশ্ব স্কাউট স্কার্ফ দিবস পালিত হয়, যা ১৯০৭ সালে ব্রাউনসি দ্বীপে প্রথম স্কাউট ক্যাম্পের স্মরণে স্কাউটরা তাদের স্কার্ফ পরে স্কাউটিংয়ের চেতনা প্রদর্শন করে।
স্কাউটিং হলো যুব সমাজকে গঠনমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি গতিশীল, সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের একটি কার্যকর হাতিয়ার। স্কাউটিংয়ের মূলনীতি মেনে চলা স্কাউটরা মাদক ও অপরাধমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ গঠনে সাহায্য করে। বিশ্বব্যাপী যুব আন্দোলন যা তরুণদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক বিকাশের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। এটি মূলত ব্যবহারিক বহিরঙ্গন কার্যক্রম, যেমন ক্যাম্পিং, হাইকিং এবং সমাজসেবার উপর জোর দেয়।
স্কাউটিংয়ের উদ্দেশ্য হলো মূল্যবোধ ও নৈতিকতা চর্চা এবং প্রতিষ্ঠাতার অবদান স্মরণ করা। তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত স্কাউটিং আন্দোলন। ঈশ্বরের প্রতি কর্তব্য, অন্যদের প্রতি কর্তব্য এবং নিজের প্রতি কর্তব্য। এর প্রধান লক্ষ্য হল তরুণদের পরিবার, সমাজ, দেশ এবং বিশ্বের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি বিকাশে সহায়তা করা।
১৯০৭ সালে লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল প্রবর্তিত স্কাউটিং আন্দোলনের মূলমন্ত্র সেবা। এটি শিক্ষার মাধ্যমে শেখা পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং সমাজকল্যাণে অবদান রাখতে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে। স্কাউটিং তরুণদের নৈতিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম শিখিয়ে পরিবার ও দেশের জন্য উপযোগী করে তোলে। এটি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ ও আন্তর্জাতিক সংহতি বৃদ্ধিতে কাজ করে। ছোট ছোট দলে কাজ করার মাধ্যমে স্কাউটরা নেতৃত্ব, দলবদ্ধ কাজ এবং সময় ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে।
জীবনের শৃঙ্খলাবোধ ফিরিয়ে আনতে স্কাউটিং যথেষ্ট সহায়ক। স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে একজন ছেলে অথবা মেয়ে নিজেকে একজন প্রকৃত অর্থে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম। ভারতীয় উপমহাদেশে স্কাউটিংয়ের সূত্রপাত ঘটে ইংরেজ শাসনামলে। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে এর নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি গঠিত হয় এবং ঐ বছরই সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বাংলাদেশ স্কাউট সমিতির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ স্কাউট নাম ধারণ করে। সংগঠনটিতে নারীদের সদস্য হওয়ার নিয়ম ছিল না। ১৯৯৪ সালে স্কাউট নারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্কাউট দিবস পালনের পাশাপাশি ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস হিসেবে বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। ১৯৭২ সালের এই দিনে বাংলাদেশে স্কাউটিংয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
স্কাউটদের প্রধান লক্ষ্য হলো সেবার ব্রত নিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা। এই দিনে স্কাউটরা তাদের প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করে এবং সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে। দেশে বর্তমানে ১০ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ জন স্কাউট রয়েছেন। স্কাউটরা স্বেচ্ছায় রক্তদান, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কমিউনিটি সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিশুকল্যাণ, নির্মাণ ও সস্তায় বাড়িঘর তৈরিতে তারা সহায়তা করে থাকেন। এ ছাড়া বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলা, অসহায় মানুষের আশ্রয় বা পুনর্বাসনে তারা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করে। সদা প্রস্তুত স্কাউট সদস্যদের নানাবিধ কার্যক্রম দেশে ও জাতি গঠনে গুরুত্ব অপরিসীম।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট