বরিশাল নগরীর পূর্বে পাশে কাউয়ার চর খেয়াঘাট। খেয়া পেরিয়ে পশ্চিম দিকে তাকালেই চোখ পরে ভিন্ন এক নগরের। নাম তার "হিরন নগর"। নামের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সেখানে নামেই নগর আছে কিন্তু নেই কোন নাগরিক সুবিধা। নেই নগরের স্বাচ্ছন্দ্য; আছে মানুষ, নেই মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার।
হিরন নগরের বাসিন্দারা সবাই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। দুই মুঠো ভাত যোগাড় করতে তারা এখন ক্লান্ত। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। কীর্তনখোলার স্বচ্ছ জলে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে। কীর্তনখোলার মৃদু ঢেউয়ে দোলে দোলে খেয়াপার হওয়ার মুহুর্তটুকু ছিল দারুণ উপভোগ্য। কিন্তু সেই মনভোলানো আনন্দ মুহুর্তেই ম্লান হয়ে গেছে।
সড়ক ধরে একটু হেঁটে হিরন নগরের কাছাকাছি আসতেই একধরনের দুর্গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সামনে এগোতে চোখে পরে এ নগর সৌন্দর্যের নয়, অন্ধকার নগর। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এখানকার নাগরিকরা।
হিরন নগরীতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ভাঙাচোরা ঘর। দালানতো দূরের কথা, ভালো টিনের ঘরও নেই এখানে। সরকারের দেওয়া পাকা ঘরগুলোরও নাজেহাল অবস্থা। বাঁশ-কাঠের খুঁটি, ফুটো টিনের চালা; যার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি ও শিশিরের পানি ঢ়ুকে ভিজে একাকার হয়ে যায় ওইসব ঘরে বসবাসরত বাসিন্দাদের মালামাল।
কোনো কোনো ঘরের বেড়া কাগজের চটের। আবার কেউ তাও জোগাড় করতে না পেরে পুরোনো সিমেন্টের বস্তা সেলাই করে বেড়া দিয়েছেন। বেড়ার সেই ছেঁড়া-ফুটো কাগজ লজ্জা ঢাকতে অনেকটাই অক্ষম।
এখানকার বাসিন্দাদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০১২ সালে দুই শতক করে জমি দিয়েছিল সরকার। বর্তমানে পরিবারে লোকসংখ্যা বেড়েছে। এক পরিবার তিন পরিবারে পরিণত হলেও বাড়েনি জমি, পরিবর্তন হয়নি তাদের ভাগ্যের।অর্থনৈতিক দুরবস্থা আর অভাব-অনটন লেগে রয়েছে এখানকার বাসিন্দাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
হিরন নগরীর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের করুন-দুর্দশার কাহিনী ও জীবনের নির্মম গল্প। ৪০ বছর বয়সের নারগিস বেগমের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় ভোর ছয়টায়। তা শেষ হয় গভীর রাতে। ক্লান্ত চোখে তিনি বলেন, ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে বাসার কাজ-কাম শুরু করি। এরপর সকাল আটটায় খেয়াপার হয়ে ওপার (বরিশাল শহর) যাই। খেয়াঘাট থেকে আধা ঘন্টা হেটে মুন্সির গ্রেজের সামনের এক বাসায় ঝিয়ের কাজ শুরু করি। সেখান থেকে কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে বিকেল। এসে সন্ধ্যা থেকে এখানে ভাপা পিঠা বিক্রি করি। তারপর ঘরের রান্না করতে শীতকালে রাত ১১টাও বেঁজে যায়।
তিনি বলেন, এই দীর্ঘ খাঁটুনির পরেও সংসারে শান্তি নেই। স্বামী কাজ করেন বিল্ডিং ভাঙার শ্রমিক হিসেবে। সপ্তাহে এক-দুইদিন কাজ জোটে। অথচ সেই কষ্টার্জিত টাকায় ১৯ বছরের বড় ছেলে নেশায় ডুবে আছে। টাকা না পেলে ভাঙচুর চালায়।
অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটিয়ে কোনমতে বেঁচে আছেন ওই নগরীর ৪২ বছর বয়সের বাসিন্দা হাসান শিকদারের পাঁচ সদস্যর পরিবার। ভাড়া করা রিকশা চালক হাসান বলেন, গড়ে প্রতিদিন সাতশ' টাকা আয় হয়। যারমধ্যে গ্যারেজে দিতে হয় চারশ' টাকা । ৭০ বছর বয়সের বিছানায় পড়া মাকে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছিনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে বরিশাল শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটারখাল বস্তির বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করা হয় সদর উপজেলার চর কাউয়া এলাকায়। তৎকালীন সিটি করপোরেশনের জনপ্রিয় মেয়র শওকত হোসেন হিরন এই কলোনির নাম দিয়েছিলেন হিরন নগর। তার (হিরন) মৃত্যুর পর এ কলোনীর বাসিন্দাদের কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। শুধু নির্বাচনের সময় ভোটের জন্য বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ওই কলোনীর বাসিন্দাদের কাছে গিয়ে তাদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা পালন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর আর কারো দেখা মিলছেনা বলে জানিয়েছেন হিরন নগরীর বাসিন্দারা।
সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমানে হিরন নগরীতে প্রায় তিনশ' পরিবারে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস। সবাই দিনমজুর। সরকারের দেওয়া সেই দুই শতক জমিতে টোঙের মতো ছোট একটি ঘর ছাড়া ফসল চাষ কিংবা গবাদি পশু পালনতো দূরের কথা এখানে হাঁস-মুরগী পালনেরও কোন জায়গা নেই।
এখানকার বাসিন্দাদের মতে, তাদের জীবনের প্রধান সমস্যা মাদকাসক্তি ও কর্মসংস্থানের অভাব। নিরাপদ পানির সংকট,পয়ঃনিষ্কাশনের দুরবস্থা, খেলার মাঠ ও সুস্থ্য বিনোদনের কোনো সুযোগ না থাকা তাদের জীবনকে আরো দুর্বিসহ করে তুলেছে।
নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা হওয়ায় জোয়ারের পানিতে প্রায়ই তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা, নারীদের প্রশিক্ষণ ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
রেহেলা বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ঘরে তার দুইটি বিবাহযোগ্যা মেয়ে, তাই দূরে কোথাও কাজে যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, মাইয়াগো বিয়া দিতে পারিনা। সন্ধ্যা হইলেই নেশাখোরদের উৎপাত বাড়ে। ঘরের পাশে বসে তারা বিভিন্ন ধরনের নেশা খায়। কিছু বললে উল্টো ধমকানি দেয়।
সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা সিডিপি'র প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার দিক থেকে এখানকার বাসিন্দারা অনেকটাই পিছিয়ে। ১৭ দশমিক ১ শতাংশ বাসিন্দা নিরক্ষর। ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ খানাপ্রধানের পেশা দিনমজুরি। তাঁদের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভূমিহীন। ভবিষ্যতে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ খানার যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত, ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ খানার স্বাস্থ্যহানী, ৯২ শতাংশ খানার নিরাপদ পানিপ্রাপ্তি ও ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ খানার জীবিকার উৎস হারানোর আশঙ্কা করা হয়েছে গবেষণার ভবিষ্যত পূর্বাভাসে।
সিডিপির বরিশাল অঞ্চলের সমন্বয়ক আ.জ.ম রাশেদ বলেন, ২০২২ সালের পর আমাদের আর পুনরায় গবেষণা হয়নি। তবে আমাদের পর্বেক্ষণ হচ্ছে, তাতে অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি; বরং এসব এলাকার মানুষের দুর্দশা আগের চেয়ে বহুগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।