যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাল্টা শুল্ক’ আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নীতিগত নজির স্থাপন করেছে। এই রায় বাংলাদেশের জন্য একদিকে স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও অন্যদিকে নতুন করে অনিশ্চয়তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঢাকা-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা পাল্টা শুল্কভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, যা নীতি নির্ধারক ও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল পাল্টা শুল্ক ব্যবস্থা। আদালতের রায়ে সেই ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় চুক্তিটির আইনি ও নৈতিক বৈধতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেহেতু চুক্তিটি এখনও দুই দেশের পক্ষ থেকে রেটিফাই হয়নি, তাই এটি কার্যকর হয়নি-এটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের পথে যেতে পারে, অথবা নতুন করে পুনরায় আলোচনা ও পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। চুক্তি নিয়ে দেশীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ নতুন নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলনামূলক বেশি বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করার মতো কঠোর শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ই-কমার্সে শুল্ক আরোপে সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকির ওপর বিধিনিষেধ এবং তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য সীমা-এসব বিষয় জাতীয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে। তাই আদালতের রায় বাংলাদেশের জন্য কেবল আইনি স্বস্তি নয়, বরং কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও এনে দিয়েছে। তবে অনিশ্চয়তা এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন করে বৈশ্বিকভাবে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা, এবং ‘আমেরিকান শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা’কে কেন্দ্র করে কঠোর বাণিজ্য নীতি অব্যাহত রাখার সংকল্প, বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই শুল্ক সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, তবুও নীতিগত অস্থিরতা বিনিয়োগ ও রপ্তানি পরিকল্পনায় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৌশলগত প্রস্তুতি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসে জাতীয় স্বার্থসম্মত শর্ত পুনর্বিবেচনার দাবি তোলা, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য উদ্যোগ জোরদার করা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ানসহ অন্যান্য বাজারে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে পণ্যের মান, প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজন বাড়িয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের জানালা খুলেছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুসংহত নীতি, দক্ষ কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশল। অন্যথায় বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির দোলাচলে দেশ আবারও অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।