সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান কিছুটা স্বস্তি দিলেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ১৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন শেয়ারমূলধনভিত্তিক বিনিয়োগ নেমে এসেছে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা প্রায় ১৭ শতাংশ কম। এই পতন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রেক্ষাপট বলছে, কোভিড মহামারির সময়ও নতুন শেয়ারমূলধন প্রবাহ ছিল ৭২০ মিলিয়ন ডলার। অর্থবছর ২০২১-২২ সালে তা ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে উঠে শীর্ষে পৌঁছায়। এরপর থেকেই ধারাবাহিক নিম্নগতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত নতুন দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি পুঁজি টানতে পারছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় এবং মূল কোম্পানির ঋণ। অর্থাৎ পুরোনো বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীর প্রবেশ বাড়ছে না। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি সীমিত আস্থার প্রতিফলন, বিস্তৃত বৈশ্বিক আস্থার নয়।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “বিনিয়োগকারীরা লাভজনকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা দেখেন।” তার মতে, বিদেশিরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, “দেশীয় বিনিয়োগ বাড়লে তা শক্ত বার্তা দেয়। স্থানীয় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হলে বিদেশিরাও আগ্রহী হন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এশিয়াসহ বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতি সীমিত বৈশ্বিক পুঁজির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। “বিনিয়োগকারীরা সেখানে যাবেন, যেখানে মুনাফার সম্ভাবনা বেশি এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রিত।” তার ভাষায়, অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ থেকে দশ বছরের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিকল্পিত হয়। ফলে তাৎক্ষণিক প্রণোদনার চেয়ে নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোর প্রস্তুতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পায়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ গবেষক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, “স্থিতিশীলতা সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সংস্কার ও বাস্তবায়ন নির্ধারণ করবে আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারব কি না।” তার মতে, জ্বালানি ঘাটতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে এখনো বড় বাধা। শিল্প সম্প্রসারণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একক সেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো প্রস্তুতি ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা সতর্কই থাকবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করে। লক্ষ্য ছিল আস্থা পুনর্গঠন ও সম্ভাবনা তুলে ধরা। তবে নতুন শেয়ারমূলধন বিনিয়োগের পতন দেখাচ্ছে, প্রচারণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো দেশীয় ভোগ ও রপ্তানির ভরসায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে, বিশেষ করে শিল্প ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বার্তা স্পষ্ট, পুরোনো বিনিয়োগকারীরা থাকলেও নতুন বৈশ্বিক অংশীদাররা এখনো দ্বিধায়।
এই দ্বিধা কাটাতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, প্রশাসনিক জট কমানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করা। নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ এখন শুধু পুঁজি আনা নয়, দীর্ঘমেয়াদে তা নিরাপদ ও লাভজনক প্রমাণ করা।