পৈতৃক জমি ফিরে পেতে বৃদ্ধ গারো দম্পতির ৩২ বছরের লড়াই

এফএনএস (শাকিল আহমেদ শাহরিয়ার; শেরপুর) : | প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
পৈতৃক জমি ফিরে পেতে বৃদ্ধ গারো দম্পতির ৩২ বছরের লড়াই

দীর্ঘ ৩২ বছরের আইনি লড়াই শেষে উচ্চ আদালতের রায় হাতে পেয়েও নিজেদের পৈতৃক জমির দখল বুঝে পাননি এক বয়োবৃদ্ধ গারো দম্পতি। ভূমি রেকর্ডে নামের বিভ্রাটের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে তারা এখনো জমি ফিরে পাননি। তবে আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। জানা গেছে, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরুনা ইউনিয়নের বাবেলাকোনা চান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুখেন দাওয়া ও তার স্ত্রী মেরিনা দালবত পৈতৃক সূত্রে ১৩ একর জমির মালিক। কয়েক যুগ আগে ওই জমি দখল হয়ে যায় বলে অভিযোগ তাদের। স্থানীয় ইউপি সদস্য আফুজল হকের যোগসাজশে জমির জীবিত মালিক মেরিনা দালবতকে মৃত দেখিয়ে ওয়ারিশ দাবি করেন প্রতিপক্ষ পিরলা দালবত। এরপর থেকেই জমিটি নিজেদের দখলে নেয় প্রতিপক্ষ। এ ঘটনায় ১৯৯৩ সালে আদালতের দ্বারস্থ হন মেরিনা দালবত। সে বছর নিম্ন আদালত তাদের পক্ষে রায় দিলেও প্রতিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০২৫ সালের মার্চ মাসে উচ্চ আদালতেও তাদের পক্ষে রায় আসে। কিন্তু এখনো তারা জমির দখল বুঝে পাননি। ভুক্তভোগীদের দাবি, জীবিত থাকা সত্ত্বেও ১৯৮৫ সালে মেরিনাকে মৃত দেখানো হয়। পরে ২০১৯ সালে একটি মিথ্যা সনদ দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য কারাভোগ করেন। মেরিনা দালবতের প্রথম স্বামী দীপেন্দ্র মারাকের মৃত্যুর পর তিনি সুখেন দাওয়াকে বিয়ে করেন। তাদের চার মেয়ে রয়েছে। ছেলে না থাকায় বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন তারা। বয়স ও অসুস্থতার কারণে জমি ফিরে পাওয়া নিয়েই এখন শঙ্কায় দিন কাটছে এ দম্পতির। ভুক্তভোগীর স্বামী সুখেন দাওয়া বলেন, ‘গারো আইনে আমার স্ত্রী পৈতৃক সূত্রে এ সম্পতির মালিক। আদালতে মামলা করে আমরা রায় পাই। তার পরও আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে। আমাদের জমিগুলো দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমার কোনো ছেলে নেই। আমি ও আমার স্ত্রী অসুস্থ। কোথাও ঠিকভাবে যেতেও পারি না। আমরা আমাদের দখল হওয়া জমি ফেরত চাই। সরকার আমাদের সহযোগিতা করুক। ভুক্তভোগী মেরিনা দালবত বলেন, ‘গারো আইন অনুযায়ী পৈতৃক ২৬ একর ১০ শতাংশ জমির মালিক আমি। এরমধ্যে ১৩ একর ১০ শতাংশ জমি আমার দখলে আছে। কিন্তু বাকি ১৩ একর জমি বিভিন্ন লোকজন আমাকে মৃত দেখিয়ে দখলের চেষ্টা করছে। আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজই অসুস্থ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে চাচ্ছি। কিন্তু তা না পারায় তাই চিকিৎসাও হচ্ছে না। স্থানীয়রা জানান, এ পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করে আসছে। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আদালতের রায় কার্যকর করে জমি প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তারা। চান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান মিজু বলেন, ‘মেরিনা এখনো জীবিত। ছোটবেলা থেকে তাকে দেখে আসছি। তার জমি দখলের চেষ্টা অন্যায়। একই এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, তাদের কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় কিছু লোক জমি দখলের পাঁয়তারা করছে। অনেক জমিতে ভূমিহীন মানুষও আশ্রয় নিয়েছে।’ শ্রীবরদী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লেবানুস মারাক জানান, মেরিনা দালবত এলাকায় মোটলা সাংমা  বা মোঠনা সাংমা নামে পরিচিত। এলাকার মানুষ তাকে বিভিন্ন নামে ডাকে। তবে, বিআরএস রেকর্ডে জমিটি ওই দুই নামে নথিভুক্ত থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম মেরিনা দালবত। নামের এই অমিলকে কাজে লাগিয়েই জমি বেহাত হয়েছে বলে দাবি তার। এ বিষয়ে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ বলেন, ‘প্রকৃত মালিক যেন জমির দখল বুঝে পান, সে বিষয়ে প্রশাসন আন্তরিক।’

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে