ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য: লাইন ধরে বিশ্লেষণ

এফএনএস অনলাইন ডেস্ক: | প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১১:২১ পিএম
ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য: লাইন ধরে বিশ্লেষণ

আজ শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত আট মিনিটের ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ইরানি হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র “বৃহৎ ও চলমান অভিযান”পরিচালনা করছে এবং তেহরানে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “বার্তাটি খুবই সরল-তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।”

বিবিসির স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতিবেদক টম বেটম্যান ও ওয়াশিংটন প্রতিনিধি ড্যানিয়েল বুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য লাইন ধরে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে তিনি হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন এবং সামনে কী ঝুঁকি থাকতে পারে।

“আমাদের লক্ষ্য আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করা”

ট্রাম্প বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনব্যবস্থার আসন্ন হুমকি নির্মূলের মাধ্যমে আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করাৃ তাদের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র, আমাদের সেনা, বিদেশে থাকা ঘাঁটি ও মিত্রদের সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল শব্দ হলো “আসন্ন হুমকি”। কংগ্রেসের অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই হামলা চালানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প এই যুক্তি সামনে এনেছেন।

তিনি তিনটি যুক্তি তুলে ধরেন-

১. ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি;

২. ইরান আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাছাকাছি, যা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে (যদিও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এর সমর্থন নেই);

৩. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে।

টম বেটম্যানের মতে, সময় নির্বাচনের পেছনে কৌশলগত হিসাব রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প মনে করেন, গাজা যুদ্ধের পর আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়ারা দুর্বল হওয়ায় ইরানি নেতৃত্ব বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

“আমরা বারবার চুক্তি করার চেষ্টা করেছি”

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো বিকল্প ছিল না, কারণ ইরান আলোচনায় গড়িমসি করেছে। তার বক্তব্য, তেহরান ওয়াশিংটনের প্রস্তাব মেনে নেয়নি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প কখনো ইরানের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের কথা বলেছেন, কখনো আবার শুধু শূন্য মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি তুলেছেন। তেহরান এটিকে অপমানজনক শর্ত হিসেবে দেখেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বরাবরই এই ঘটনাকে আলোচনার বদলে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে এসেছে।

“মার্কিন সামরিক বাহিনী বৃহৎ অভিযান শুরু করেছে”

ট্রাম্প জানান, “অপারেশন এপিক ফিউরি”ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে অভিযান কতদিন চলবে বা কতটা বিস্তৃত হবে-সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি।

তিনি কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও নেননি, যা ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের ক্ষুব্ধ করেছে। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন প্রশাসনের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্রিফিং প্রত্যাশা করেছেন।

ড্যানিয়েল বুশের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ট্রাম্প দেশীয় জনমত নিজের পক্ষে টানতে চাইছেন। তবে এমন সময়ে বিদেশে সামরিক অভিযান ঘিরে জনসমর্থন ধরে রাখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, যখন অনেক ভোটার অর্থনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে বেশি মনোযোগ চান।

“যুদ্ধে প্রাণহানি ঘটতে পারে”

ট্রাম্প স্বীকার করেন, “সাহসী আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে।” বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি হিসাবি ঝুঁকি। তিনি হয়তো মনে করছেন, সীমিত ক্ষয়ক্ষতি রেখে সামরিক সাফল্য অর্জন করলে তা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।

তবে সংঘাত বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র আবার দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে-যা ট্রাম্প অতীতে এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

“অস্ত্র সমর্পণ করুন, না হলে নিশ্চিত মৃত্যুৃ”

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, তারা যেন অস্ত্র সমর্পণ করে; অন্যথায় “নিশ্চিত মৃত্যু”র মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেওয়া বার্তা। তবে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর ঘটনাতেও বিকল্প নেতৃত্ব কাঠামো প্রস্তুত রয়েছে।

সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে-ইরানে গৃহসংঘাত, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি।

“ইরানের জনগণ, স্বাধীনতার সময় এসে গেছে”

ইরানি জনগণের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, “আমরা শেষ করলে আপনারাই সরকার গ্রহণ করবেনৃ এটি হয়তো প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ।”

এ বক্তব্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান থাকলেও একই সঙ্গে রয়েছে কড়া সতর্কবার্তা। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প একদিকে শান্তির দূত হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়তে চান, অন্যদিকে ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশা করছেন।

তবে এই অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী-তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলাফল প্রত্যাশামাফিক না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে ট্রাম্পের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সূত্র: বিবিসি

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে