সর্বোচ্চ নেতা নিহতের পর ইরানে আরও হামলা, পাল্টা আঘাতে উত্তেজনা চরমে

এফএনএস অনলাইন ডেস্ক: | প্রকাশ: ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
সর্বোচ্চ নেতা নিহতের পর ইরানে আরও হামলা, পাল্টা আঘাতে উত্তেজনা চরমে
ছবি, সংগৃহিত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর রোববার আরও এক দফা হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উভয় দেশ দাবি করেছে, সরকার পতনের লক্ষ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযানে বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও ৮৬ বছর বয়সী নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।

রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যকেন্দ্র দুবাই এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এর আগে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।

ইরান ঘোষণা দিয়েছিল, হামলার শিকার হলে তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। সে অনুযায়ী বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানায় তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার ভোরে ইসরায়েলজুড়ে বারবার বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। তেল আবিবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যেখানে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার চেষ্টা চালায়। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্পের দাবি: ইরানি হুমকি বন্ধেই হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, কয়েক দশকের ইরানি হুমকির অবসান ঘটানো এবং তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই এ হামলার উদ্দেশ্য।

ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, এটি শুধু ইরানের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নয়, বরং খামেনি ও তার সহযোগীদের হাতে নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্যও ন্যায়বিচার।

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, এই হামলা তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব উৎখাতের বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর দুর্বলতার কারণে ইরানের নেতৃত্ব আগে থেকেই চাপে ছিল।

মার্কিন সূত্রগুলোর দাবি, খামেনি ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের বৈঠকের সময় হামলার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হামলার সময় তিনি দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন।

পাল্টা আঘাতের হুমকি

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার সকালে তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এক বিবৃতিতে জানায়, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও বড় আকারের পাল্টা হামলা চালানো হবে।

শনিবারের প্রাথমিক হামলার জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোর বিভিন্ন শহর ও ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক পড়ে। পেন্টাগন জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

উপসাগরীয় অবকাঠামোয় আঘাত, তেলের বাজারে শঙ্কা

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর শনিবার দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-যেখানে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয়-এবং আবুধাবি ও কুয়েতের বিমানবন্দরেও হামলার প্রভাব পড়ে।

দুবাইয়ের প্রতীকী বুর্জ আল আরব হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

তেহরান শনিবার সতর্ক করে জানায়, বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে, সেটি তারা বন্ধ করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ওপেক প্লাসভুক্ত প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলো রোববার বৈঠকে বসছে। প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন স্থগিত করায় উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অনিশ্চয়তা

ইরানে ১২ দিনের বিমানযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগেই সতর্ক করেছিল, তেহরান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রাখলে আবার হামলা চালানো হবে।

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন। পাল্টা হামলাকে তিনি আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে খামেনির মৃত্যুর খবরে তেহরান, কারাজ ও ইসফাহানে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি।

পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায়।

সূত্র: রয়াটার্স