বাংলাদেশে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো নাগরিক সেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ওয়েবসাইট এক যুগ ধরে পুরোনো সংস্করণেই চলছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির যুগে যেখানে প্রতিদিন নতুন ফিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত হচ্ছে, সেখানে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো এখনো পুরোনো কাঠামোতে আটকে আছে। এর ফলে নাগরিকরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্য হালনাগাদ না হওয়া। অনেক ওয়েবসাইটে বছরের পর বছর পুরোনো তথ্য পড়ে থাকে। নতুন নীতি, বিজ্ঞপ্তি বা সেবা সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে নাগরিকরা বিভ্রান্ত হন এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য বারবার অফিসে যেতে হয়। এদিকে, অকার্যকর লিংক ও ফাইলও একটি বড় সমস্যা। অনেক ওয়েবসাইটে লিংক কাজ করে না, ফাইল ডাউনলোড হয় না, কিংবা পেজ খোলে না। এতে নাগরিকদের সময় নষ্ট হয় এবং তারা অনলাইন সেবার প্রতি আস্থা হারান। নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। পুরোনো সংস্করণে চলায় সাইবার নিরাপত্তা দুর্বল। হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থাকে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে না। অনেক ওয়েবসাইটে এখনো সুরক্ষিত সংযোগ (ঐঞঞচঝ) নেই, যা তথ্য চুরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। সার্ভার সমস্যাও নিয়মিত দেখা যায়। অনেক ওয়েবসাইটে সার্ভার ডাউন থাকে, ফলে প্রয়োজনীয় সময়ে সেবা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ, চাকরির আবেদন বা সরকারি ফরম ডাউনলোডের সময় ওয়েবসাইটে চাপ বাড়লে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে নাগরিকরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনলাইনে সেবা নিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে সরাসরি অফিসে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ ও শ্রম নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি সেবা না পাওয়ায় মানুষকে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, চাকরির আবেদন বা পরীক্ষার ফলাফল দেখতে গিয়ে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায় না। ফলে আবেদনকারীরা শেষ মুহূর্তে সমস্যায় পড়েন। আবার জমি বা ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে না পেয়ে মানুষকে দালালের কাছে যেতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ওয়েবসাইটগুলোকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করতে হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং মোবাইল ফ্রেন্ডলি করতে হবে। একই সঙ্গে সার্ভার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে চাপের সময়েও ওয়েবসাইট সচল থাকে। সরকারি সেবাকে ডিজিটাল করতে হলে ওয়েবসাইটগুলোকে ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। নাগরিকরা যেন সহজে তথ্য পান, আবেদন করতে পারেন এবং অনলাইনে সেবা গ্রহণ করতে পারেন- এটি নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণেই জাতীয় তথ্য বাতায়নের অধীনে থাকা ৩৬ হাজার ৪শ ওয়েবসাইটকে নতুন সংস্করণে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটুআই প্রোগ্রামের অধীনে ধাপে ধাপে সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের কাজ চলছে। নতুন সংস্করণে মাইক্রো সার্ভিস কাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে কোনো অংশে সমস্যা হলেও পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে না যায়। ডাটাবেজ ডিস্ট্রিবিউটেড থাকায় একসঙ্গে চাপ পড়লেও সাইট সচল থাকবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, ডাউন টাইম কম থাকবে এবং দ্রুত কন্টেন্ট পরিবর্তন করা যাবে। তবে আপগ্রেডেশনের সময় মাঝেমধ্যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেক ওয়েবসাইট ডাউন হয়ে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর সচল হচ্ছে। এটুআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাটা মাইগ্রেশনের কারণে এ সমস্যা হচ্ছে, তবে দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। তারা বলছেন, এর পেছনে মাত্র তিন কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তথ্য হালনাগাদ না করার প্রবণতা কিন্তু এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত বছর সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক ওয়েবসাইটে এখনো পুরোনো তথ্য রয়েছে। এটুআই কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি দিক তারা দেখেন, কিন্তু কনটেন্ট হালনাগাদ করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব। জাতীয় তথ্য বাতায়ন জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় নাগরিকরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না। এক যুগ পর সরকারি ওয়েবসাইটগুলো নতুন সংস্করণে যাচ্ছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হবে। তবে মূল সমস্যা থেকে যাবে যদি তথ্য হালনাগাদ না হয়। জনগণের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সফটওয়্যার আপগ্রেড নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। অন্যথায় কোটি টাকা ব্যয় করেও নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।