সংকটের মধ্যেই যন্ত্রাংশ চুরির হিড়িক, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় রেল

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৪ এএম
সংকটের মধ্যেই যন্ত্রাংশ চুরির হিড়িক, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় রেল

বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন খাত হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি নানা সংকটে জর্জরিত। ইঞ্জিনের ঘাটতি, যন্ত্রাংশের অভাব, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে রেলওয়ে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ভয়াবহ প্রবণতা- চলন্ত ট্রেন থেকে শুরু করে স্টেশন ইয়ার্ড পর্যন্ত রেলের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি। প্রতিনিয়তই কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সর্বশেষ ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী একটি ট্রেনের এসি কোচ থেকে কনডেন্সার কয়েল চুরির ঘটনা আলোচনায় এসেছে। যন্ত্রাংশটি এসি চালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুরির কারণে পুরো কোচের এসি বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। একই ধরনের ঘটনা গত কয়েক মাসে একাধিকবার ঘটেছে। পঞ্চগড় রেলস্টেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কোচটি বাতিল ঘোষণা করতে হয়েছে এবং যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। এ ধরনের চুরি শুধু যাত্রীদের ভোগান্তি নয়, রেলের রাজস্ব আয়েও প্রভাব ফেলছে। একটি কোচ বাতিল হলে সেই রেকের আসন সংখ্যা কমে যায়, ফলে আয়ও কমে যায়। এদিকে যন্ত্রাংশ চুরির সাথে জড়িত খোদ রেলেরই কিছু অসাধু কর্মী। গত বছর জুনে নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেললাইনসহ মালামাল চুরি করে বিক্রির অভিযোগে রেলওয়ের এক প্রকৌশলীকে আটক করা হয়। তদন্তে দেখা গেছে, ভোর রাতে প্রকৌশলীর কার্যালয়ের স্টোর থেকে রেললাইন কেটে দুটি পিকআপে পাচার করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার ও কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতা আবারও সামনে আসে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রেলওয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্টেশনে প্রায় ৬ হাজার ওয়াগন, ক্যারেজ ও ট্যাংক বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। শত শত কিলোমিটার পরিত্যক্ত রেল পার্টিও অবহেলায় পড়ে আছে। এসবের অনেক অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে, আবার অনেক জায়গায় মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যক্রমের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে এসব স্ক্র্যাপ বিক্রি করে মাত্র ৯০ লাখ টাকা আয় হয়েছে। অথচ নষ্ট হওয়া মালামালের মূল্য হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়া ও আইনি জটিলতার কারণে বিক্রি বিলম্বিত হচ্ছে। সূত্রমতে, রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। ২০ বছর আগে যেখানে শতাধিক মালবাহী ওয়াগন চলত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২০-২৫টিতে। ইঞ্জিনের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ১৯৫৩ সালে আমদানিকৃত অনেক ইঞ্জিন এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই। ফলে ট্রেন মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে থাকে, ব্যবসায়ীরা রেলপথে পণ্য পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে স্বাভাবিকভাবে পণ্যবাহী একটি ট্রেনের সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা, কিন্তু ইঞ্জিন বিকলের কারণে কখনো কখনো দুই থেকে তিন দিনও লেগে যাচ্ছে। চলন্ত ট্রেন থেকে যন্ত্রাংশ চুরি হওয়া যেমন নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন, তেমনি প্রকৌশলীর মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে সামনে নিয়ে আসে। যন্ত্রাংশ চুরির কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। এসি কোচে যাত্রীরা গরমে কষ্ট পাচ্ছেন, বাতিল হওয়া কোচের কারণে টিকিট ফেরত দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রেলের আয় কমছে। মালবাহী ওয়াগন নষ্ট হয়ে পড়ে থাকায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে পড়ে থাকা ওয়াগন ও ক্যারেজগুলো শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক সমস্যাও তৈরি করছে। অনেক জায়গায় এসব বগি মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যক্রমের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে, অথচ রেল কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের যন্ত্রাংশ চুরি রোধে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি স্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অব্যবহৃত ওয়াগন ও যন্ত্রাংশ দ্রুত নিলামে বিক্রি বা সংস্কার করতে হবে। ইঞ্জিন সংকট নিরসনে নতুন ইঞ্জিন আমদানি জরুরি। একই সঙ্গে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। যোগাযোগ বিশেজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন খাত। অথচ ইঞ্জিন সংকট, অব্যবস্থাপনা ও যন্ত্রাংশ চুরির কারণে এটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, চুরি হচ্ছে, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় বন্ধ করতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে রেলওয়ের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান আরও সীমিত হয়ে পড়বে।