প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম

প্রকাশ ঘোষ বিধান | প্রকাশ: ৩ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০২ এএম
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম
প্রকাশ ঘোষ বিধান

বন্যপ্রাণী আমাদের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় বিশেষ প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাণী রক্ষা করতেই সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস পালন করা হয়। যার মূল লক্ষ্য বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি রক্ষায় কাজ করা।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার ভূমিকা অনেক। বাতাস থেকে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়ে দিই। অন্যদিকে গাছপালা কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। সুতরাং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে গাছপালার অবদান অপরিসীম।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদ অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মৌমাছি, পাখি ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গ পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং নতুন উদ্ভিদ জন্মাতে সাহায্য করে। বাঘ, সিংহ বা শিকারি প্রাণীরা তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখে। বন্যপ্রাণী পরাগায়ন, বীজ বিস্তরণ এবং খাদ্য শৃঙ্খল বজায় রেখে বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও মাটির উর্বরতা নিশ্চিত করে।

২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ৬৮তম অধিবেশনে ৩ মার্চকে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস হিসেবে মনোনীত করা হয়। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ রোধে পদক্ষেপ নেওয়া। যা বন উজাড়, চোরা শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিগুলো তুলে ধরে বিশ্বের বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদকূলের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।

প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। জলবায়ু পরিবর্তন, চোরা শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে অনেক বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির পথে। এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণ ও উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম।

বিশ্বে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য মানুষ হরহামেশাই বন উজাড় করছে। এতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক বন্যপ্রাণীও। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক বন্যপ্রাণী। বন উজাড়, চোরা শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মতো বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর পৃথিবী থেকে কোনও না কোনও বন্য প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হচ্ছে বা বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। জাতিসংঘের এক তথ্যমতে, বর্তমানে বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির হার গত ১০ লাখ বছরের তুলনায় অন্তত দশ থেকে শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো লাতিন আমেরিকা ও আমাজনে বন উজাড়ের হার বৃদ্ধি। ইতিমধ্যে মূল বনভূমির ১৭ শতাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, আরেকটি ১৭ শতাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩১টি। তবে এ সংস্থাটির দাবি বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০ এর বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৯০টি একেবারে শেষ হওয়ার পথে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বে এ পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। এভাবে বাংলাদেশের ভূখন্ড থেকে হারিয়ে গেছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী। এছাড়াও বাংলাদেশে অন্তত ২১৯টি প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন। এই তালিকার মধ্যে আছে উভচর সরীসৃপ,পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বনবিভাগের এক হিসাবে ৪২ প্রজাতির উভচরের মধ্যে ৮টি, ১৫৮টি প্রজাতির সরীসৃপের মধ্যে ৬৩টি, ৭৩৬টি প্রজাতির পাখির মধ্যে ৪৭টি, ১২৪টি স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ৪৩টির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন।

বিশ্বের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদকূলের প্রতি সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য ৩মার্চ দিন নির্দষ্ট করা হয়েছে। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদদের রক্ষার্থের গৃহীত হয় নানা রকম পদক্ষেপ। তাদের রক্ষার স্বার্থে পালিত হয় বিভিন্ন আলোচনা সভা। বিশ্বের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদকূলের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করাই হল এই দিবসের মূল লক্ষ্য।  তবে বন্যপ্রাণী পাচার করা যে অপরাধ তা অনেকে জানে না। অনেকে অভাবের কারণে, অনেকে কাজের জন্য, অনেকে আবার শখ করেও বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ নিধনের মত এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

গাছ ছাড়া প্রাণীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, আবার অনেক উদ্ভিদ প্রাণীর ওপর পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারের জন্য নির্ভরশী। জীববৈচিত্র‍্য বা বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি বাস্তুতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখে। বন্যপ্রাণীর বর্জ্য ও মরা দেহ পচে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। বাস্তুতন্ত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে অনেক বন্যপ্রাণী রোগ ছড়ানো প্রতিরোধ করে। পরিবেশের ভারসাম্য ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন ছেড়ে দেয় যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গাছপালা দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে এবং বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি করে। বৃক্ষের শিকড় মাটি ধরে রেখে ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং বন্যা বা ঝড় থেকে উপকূল রক্ষা করে। বনের প্রাণীরা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুসংস্থান সুসংহত রাখে। বাঘ, সিংহ, হাতি, পান্ডা, এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের অস্তিত্ব টিকে থাকা পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য। বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদকুল রক্ষ এবং আইনগত সুরক্ষার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে  বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা পাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট