রঙের উৎসব হোলি

প্রকাশ ঘোষ বিধান | প্রকাশ: ৩ মার্চ, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
রঙের উৎসব হোলি
প্রকাশ ঘোষ বিধান

দোলযাত্রা বা হোলি হলো একটি প্রধান হিন্দু উৎসব। যা বসন্ত, প্রেম এবং রঙের উৎসব নামেও পরিচিত। এই উৎসবের মাধ্যমে রাধা-কৃষ্ণের শাশ্বত ও ঐশ্বরিক প্রেম উদযাপন করা হয়। হোলিকা দহন অশুভ শক্তির বিপরীতে শুভ শক্তির জয় নির্দেশিত করে। এটির উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশে হওয়ায় সেখানে বেশি উদযাপিত হয়, তবে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের মাধ্যমে এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল এবং পশ্চিমা বিশ্বের বেশকিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ছে।

দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। যাকে অনেকে বসন্তোৎসবও বলে থাকে। দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণবীয় উৎসব। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয় বলে একে গৌরপূর্ণিমাও হয়। এটি ভারতের বিভিন্ন স্থানে হোলি উৎসব নামেও পরিচিত। তবে, প্রকৃতপক্ষেঃ এটি আসলে অনেকটা ভিন্ন ধরনের উৎসব; তবে মূল-বিচারে বলা চলে এরা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এই পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জন্ম-গ্রহণ করেন বলে একে গৌর-পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।

বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে বা দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনের নন্দ কাননে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে তার সখী রাধিকা দেবী ও গোপীগণের সাথে রং খেলায় মেতেছিলেন। যার অনুকরণ থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। সনাতন হিন্দু ধর্মীয় আচার আচরণ-গুলোর মধ্যে সবচেয়ে সার্বজনীন উৎসব হিসেবে এটিই স্বীকৃত।

দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারী-পুরুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবির ও গুলাল নিয়ে রং খেলায় মত্ত হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে ভগবান কৃষ্ণ ও রাধিকা দেবীর বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করা হয়। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্নি-উৎসবের আয়োজন করা হয়। একে হোলিকা-দহন বা মেড়া-পোড়া নামে অভিহিত করা হয়।

হোলির সঙ্গে নানান পৌরাণিক কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রহ্লাদের ভক্তি, হিরণ্যকশিপু বধের কাহিনি, আবার রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলার সুবাস রয়েছে এই উৎসবে। দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি মতে, ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুলে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি ।

অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহাআনন্দে পরিণত হয়।

শিব-পুরাণমতে, হিমালয়-কন্যা পার্বতী শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করছিলেন। অন্যদিকে শিব কঠোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। দেবতারা জানতেন যে সৃষ্টির কল্যাণের জন্য শিব-পার্বতীর বিয়ে জরুরি। এ কারণে দেবতাদের পরামর্শে কামদেব শিবের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য তাঁর ওপর পুষ্পবাণ নিক্ষেপ করেন। এই বাণ মহাদেবের মধ্যে প্রেম ও কাম ভাবনা উৎপন্ন করায় তাঁর তপস্যা ভঙ্গ হয়। ক্ষুব্ধ শিবের তৃতীয় নেত্রের আগুনে ভস্ম হয়ে যান কামদেব। তাঁর স্ত্রী রতির আকুল মিনতিতে সাড়া দিয়ে কামদেবকে পুনর্জীবন প্রদান করেন মহাদেব। অন্যদিকে দেবতাদের নিবেদনে পার্বতীকে বিয়ে করতে সম্মত হন শিব। তিথিটিই ছিল ফাল্গুন পূর্ণিমা, যাকে উৎসবের মতো উদ্‌যাপন করেছিলেন দেবতারা। এমন নানা গল্প-কাহিনিতে মোড়ানো দোল বা হোলি উৎসব।

অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক। বাংলায় আমরা বলি দোলযাত্রা আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে হোলি। রঙ উৎসবের আগের দিন হোলিকা দহন হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে হোলিকা দহন হয়। পরের দিন রঙ খেলা।

দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন চাঁচর উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়, হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য পায়। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদযাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও জৈমিনি মীমাংশায় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক হোলিকোৎসব পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক রত্নাবলীতেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুণীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হতেন।

হোলি ধর্ম ও সমাজে ওতোপ্রোত জড়িত। আর একটি উৎসব বা দিন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে যদি উক্ত দিনে পৃথিবী মহান পুরুষের জন্ম দেয়। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন হিন্দু ঐতিহ্যের মধ্যে হোলি উৎসবের একটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। অতীতের ত্রুটিগুলি শেষ করে নিজেকে পরিত্রাণ দেওয়া, অন্যদের সাথে দেখা করে দ্বন্দ্ব শেষ করা, ভুলে যাওয়ার এবং ক্ষমা করার একটি দিন। ঋণ পরিশোধ করে বা ক্ষমা করে, তাদের সাথে নতুন করে শুরু করে এবং হোলি বসন্তের সূচনাকেও চিহ্নিত করে। নতুন ঋতু উপভোগ করার ও নতুন বন্ধু তৈরি করার একটি উপলক্ষ হোলি উৎসব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট