দূরের যুদ্ধ, কাছের দুঃশ্চিন্তা

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ৩ মার্চ, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
দূরের যুদ্ধ, কাছের দুঃশ্চিন্তা
রাজু আহমেদ

ইরান বনাম ইজরায়েল, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা থেকে হাজার মাইল দূরে। মিসাইল কিংবা ড্রোন ভুলেও বাংলাদেশের আকাশ সীমায় উড়ে আসবে, এই ভূখন্ডে আছড়ে পড়বে- সেটার দূরতম শঙ্কাও নাই। তাদের একটা যুদ্ধ বিমানও বাংলাদেশের আকাশ প্রদক্ষিণ করবে না। তবুও এই যুদ্ধে বড় ক্ষতি বাংলাদেশেরও হবে। আমাদেরকেও বহন করতে হবে। 

এই যুদ্ধ যদি সপ্তাহ বা পক্ষকাল স্থায়ী হয় তবে বাংলাদেশের জনগণের নসীবেও দুর্ভোগ আছে। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের উৎপাদন এবং গতি প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে তেল এবং গ্যাসের ওপর। তেল সম্মৃদ্ধ প্রায় সবগুলো দেশ মধ্যপ্রাচ্যে। বাংলাদেশে এলএনজি প্রদানকারী শেল, বিপি, আরামকো এবং গ্লেনকোর মতো বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর কাঁচামালের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির নিচে। যে বালুময় মাটির ওপরেই মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে ইরানের ছোঁড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল। আপনি কী আন্দাজ করতে পারছেন নিকট ভবিষ্যতে কী ঘটবে? আমদানি নির্ভর খাদ্যপণ্যের কথা তো বাদই দিলাম। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে দেশের বাজারে পণ্যের মূল্যে আগুন লাগবে। আলো মানে বিদ্যুত উৎপাদনেও ধ্বংস নামবে। 

মূল আশঙ্কা এসবেও নয়। শুধু মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে কোটির ওপরে বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছে। তাদের প্রেরিত অর্থে শুধু তাদের পরিবার চলে না বরং সেই রেমিট্যান্স রিজার্ভ,  বৈদেশিক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখে। যুদ্ধের প্রকোপে তারা যদি কর্মহীন হয়ে পড়ে তবে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে অন্ধকার নেমে আসবে। ইতোমধ্যেই প্রবাসীতের নিয়োগকারী অনেক কোম্পানি তাদের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। 

আল্লাহ আল্লাহ করুন, তসবি জপ করুন যাতে শীঘ্রই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়। যুদ্ধ থেমে যায়। এই যুদ্ধের সময় যত লম্বা হবে তত বিপদ আমাদের দেশের মত বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরনির্ভরশীল দেশের বাড়তেই থাকবে। বাজারদর বাড়লে, বিদেশের বাংলাদেশিরা কর্মহীন হয়ে পড়লে চারদিকে অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ো পড়বে। এমনিতেই আয়ের সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার মূল্যের সঙ্গতি নাই। তারপরে আবার যদি মরার ওপর খড়ার ঘাঁ হয়ে তেল ও গ্যাসের মূল্য বাড়ে, বাজারে খাদ্যদ্রব্যের সংকট সৃষ্টি হয় তবে যুদ্ধের পরিণাম চিন্তাতেও ছড়িয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতীচ্যের দিকে ধাবিত হবে। আমাদের ঘিরে ধরবে অনিশ্চয়তা। 

এক পক্ষের যুদ্ধই বাণিজ্য। তারা যুগে যুগে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। তারা ক্ষমতা ও স্বার্থের জন্য অনিয়মকেই নিয়ম বানিয়েছে। হাজার হাজার নিরীহ শিশু, দুর্বল নারী এবং বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতালে আক্রমন করেই তারা যুদ্ধের সূচনা করেছে। এই অসাধু ও শয়তানগণ এবং তাদের দোসররা যুগে যুগে আবির্ভূত হয়েছে পরাশক্তি ও মোড়ল হিসেবে। যাকে ইচ্ছা তাকে খুন করা, যাকে ইচ্ছা তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো বর্বরতা তাদের রোজকার রুটিন। 

জগতে কেউ সাধু না। কিন্তু যারা দায়ী না তাদের সাথে জুলুম অহরহই হচ্ছে। দুধের শিশু, বৃদ্ধ নারী-পুরুষ কিংবা বেসামরিক নাগরিক- তাদের দায় কীসে? ক্ষতিপূরণ তো সবাইকেই মেটাতে হচ্ছে। মিথ্যা অভিযোগ তুলে, অপবাদ দিয়ে যারা একটা দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে তারা সভ্য সমাজের অন্ধকার দাগ। তাদের পাপের ফল ভোগ করতে হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীকে। আশা করি অন্ধকার ভেদিয়া আলোর ফুল ফুটবে। পাখি আবার গাইবে গান। ফিলিস্তিনের বুকে তৈরি হবে গোলাপের বাগান।

লেখক: প্রাবন্ধিক