কৃষিযন্ত্রের বাজার দখল করে রেখেছে বিদেশি পণ্য

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৪ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
কৃষিযন্ত্রের বাজার দখল করে রেখেছে বিদেশি পণ্য

বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে শ্রমনির্ভর। তবে গত দুই দশকে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। ধান কাটার মৌসুমে মাঠে কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, থ্রেসার- এসব যন্ত্র এখন সাধারণ দৃশ্য। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বাজারে দেশীয় পণ্যের অবস্থান দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিদেশি কোম্পানির তৈরি কৃষিযন্ত্র বাজার দখল করে নিচ্ছে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে পারছেন না, আর কৃষকরা বিদেশি যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। সামপ্রতিক বাজার বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে কৃষিযন্ত্রের বাজারে চীন, ভারত ও জাপানের তৈরি যন্ত্রই আধিপত্য বিস্তার করছে। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার- সব ক্ষেত্রেই বিদেশি ব্র্যান্ড শীর্ষে। ২০২২ সালে বাংলাদেশে কৃষিযন্ত্র আমদানি হয়েছে প্রায় ৫৩.৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের, অথচ দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি ছিল মাত্র কয়েক হাজার ডলার। চীনা যন্ত্র তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় গ্রামীণ কৃষকরা তা কিনতে আগ্রহী। ভারতীয় ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার মানসম্মত হওয়ায় বাজারে জনপ্রিয়। জাপানি কম্বাইন হারভেস্টার প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হওয়ায় বড় কৃষক ও ঠিকাদাররা তা ব্যবহার করছেন। ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। কৃষিযন্ত্রাংশের বিশাল বাজার তৈরি হলেও তাতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর হিস্যা এক-তৃতীয়াংশেরও কম। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ছোট যন্ত্রাংশের ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকার বাজার দখল করেছে। বাকিগুলো আমদানিনির্ভর। বড় বড় যন্ত্রাংশের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আসে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট-বড় মিলে দেশে সার্বিক কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার ১২ হাজার কোটি টাকার। এরমধ্যে শুধু ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বড় বড় যন্ত্রাংশের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার। এই বাজার দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। দেশের বাজারে ছোট-বড় কৃষি যন্ত্রাংশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এসিআই। কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আসছে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি। এসিআই মোটরস লিমিটেড ২০১৮ সালে মানিকগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছে এসিআই অ্যাগ্রি মেশিনারি ফ্যাক্টরি। এখানে জাপানের ইয়ানমারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে তারা। দেশে যে পরিমাণ কৃষিযন্ত্র বিক্রি হচ্ছে তার মধ্যে ট্র্যাক্টর বিক্রিতে ৫০ শতাংশ, কম্বাইন হারভেস্টারের ৪৩ শতাংশ, পাওয়ার টিলারের ৩৪ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশের ১০ শতাংশ বাজার শেয়ার এসিআইয়ের। অ্যাগ্রিকালচার মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের তথ্যমতে, বেসরকারি পর্যায়ে ছোট-বড় মিলে দেশে প্রায় ৮০টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরি ও সংযোজনের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে মাঝারি ও বড় কারখানা ১৪টি। এছাড়া ছোট-বড় আরও হাজারখানেক হালকা প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান এক বা একাধিক কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত ছোট পরিসরের। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ফসল লাগানোর আগে জমি তৈরির ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর ব্যবহার হচ্ছে ৯০-৯৫ শতাংশ জমিতে। বালাইনাশক ব্যবহারে ৯০ শতাংশ এবং ফসল মাড়াইয়ে ৭৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে। তবে শস্য রোপণে যন্ত্রের ব্যবহার এখনো কম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের গবেষণা বলছে, চাষ, সেচ, নিড়ানি, কীটনাশক প্রয়োগে ৮০-৯৫ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। যদিও ফসল রোপণ, সার দেওয়া, কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার কম। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কৃষিযন্ত্রের মধ্যে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বছরে ২৫ হাজার পাওয়ার টিলার বিক্রি হচ্ছে। ট্রাক্টর বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার ৬০০টি। ফসল মাড়াইয়ের কাজে বিভিন্ন ধরনের থ্রেশারের ব্যবহার বাড়ছে। বছরে প্রায় ৫০০ থ্রেশার বিক্রি হচ্ছে। ধান কাটার যন্ত্র রিপার বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বিক্রি হচ্ছে। কম্বাইন হারভেস্টার বছরে প্রায় ২০০টি বিক্রি হচ্ছে। ধান রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার বছরে ৫০ থেকে ৬০টি বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে কৃষিযন্ত্রের মাত্র ২০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়, বাকি ৮০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। সঠিক নীতি, অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে এই ২০ শতাংশ অচিরেই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। কৃষি উৎপাদনে আরেকটি বড় সংকট হলো অবকাঠামো ও যান্ত্রিক ঘাটতির কারণে ফসলের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে ফল ও শাক-সবজিতে এ অপচয় বেশি। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার ও রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও লজিস্টিকস উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিযন্ত্র বাজারে প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ১১ থেকে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ আরও বাড়বে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি যদি বিদেশি যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে হয়, তবে দেশীয় শিল্প আরও পিছিয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিযন্ত্রের বাজারে দেশীয় পণ্যের অবস্থান শক্ত করতে হলে- গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে। কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী দামে দেশীয় যন্ত্র সরবরাহ করতে হবে।