ইসরায়েলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের, যুদ্ধ সীমিতের প্রস্তাব আটকাল যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৫ মার্চ, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
ইসরায়েলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের, যুদ্ধ সীমিতের প্রস্তাব আটকাল যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে ইরানকে ঘিরে সংঘাত। ইসরায়েলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান, একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন রিপাবলিকানরা। এতে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ভোরে ইরান দেশটির দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। দুই ঘণ্টার মধ্যে তিনবার সতর্কতা জারি করা হয় এবং জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে এএফপি জানিয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ষষ্ঠ দিনে পৌঁছেছে সংঘাত। ওই হামলা শুরুর দিন শনিবারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও বাহরাইনসহ মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে অবস্থিত ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা অন্তত নয়। ইরানে নিহতের সংখ্যা সহস্র ছাড়িয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, কাতার ও বাহরাইনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। উত্তর উপসাগরে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবিও করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের সমর্থক দেশগুলোর সামরিক বা বাণিজ্যিক জাহাজকে ওই এলাকায় চলাচল করতে দেওয়া হবে না।

তেহরান বলছে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার তাদের রয়েছে। ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ অধিকার দাবি করছে তেহরান।

সংঘাতের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ইতালি। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো ইতালিও ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে বহু ইতালীয় নাগরিক বসবাস করেন এবং প্রায় দুই হাজার ইতালীয় সেনা সেখানে মোতায়েন রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এসবিএস নিউজ জানায়, এ জন্য ইতোমধ্যে দুটি সামরিক বিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং সহায়তার একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, “আমরা এসব হুমকি শনাক্ত করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করছি।” প্রকাশিত ভিডিওতে ইরানের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। তিনি বলেন, “প্রথম দিনেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক অভিযান সীমিত করার একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন রিপাবলিকান সদস্যরা। প্রস্তাবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিমান হামলা বন্ধ করা এবং এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল।

ডেমোক্র্যাট এবং কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য এই উদ্যোগকে বিদেশে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছিলেন। তবে বিরোধীরা বলছেন, প্রধান সেনাপতি হিসেবে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জিম রিশ বলেন, “এটি কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নয়, এমনকি তার কাছাকাছিও নয়। এটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।”

এদিকে দক্ষিণ লেবাননেও নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, টায়ার অঞ্চলের আল শাহাবিয়া জেলা এবং বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে হামলা হয়েছে। আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, নাবাতিয়ে এলাকাতেও বিমান হামলা হয়েছে। সোমবার থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন।

রয়টার্স বলছে, একই সময় ইরাকের কুর্দি অঞ্চলেও ইরানবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ওপর সামরিক অভিযান চালিয়েছে তেহরান। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সুলাইমানিয়া অঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাতকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক দেশ উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানালেও বাস্তবে সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে