বাংলাদেশের চামড়া শিল্প একসময় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত ছিল। পোশাক শিল্পের পরেই এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় অবদান রাখত। কোরবানির ঈদে সংগৃহীত কাঁচা চামড়া থেকে শুরু করে সাভারের ট্যানারি শিল্পে প্রক্রিয়াজাতকরণ- সব মিলিয়ে এটি ছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক চক্র। কিন্তু প্রায় নয় বছর হতে চললেও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এর ফলে পরিবেশ দূষণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো এবং রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার মতো বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হয়েছে। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধের লক্ষ্যে সরকার ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে এই শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারে নেওয়া হয়। ২০২১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ১৬২টি ট্যানারিকে সেখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে সচল ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ১৪৭টি। কিন্তু এত বড় শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনো পরিবেশের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়নি। সিইটিপি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু পরিবেশবিদরা বলছেন, কোরবানির সময় তরল বর্জ্যের লোড নিতে না পারায় ক্রোমযুক্ত পানি নদীতে যাচ্ছে। কঠিন বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে রাখা হচ্ছে, যা পানি ও বায়ু দূষণ করছে। গত আগস্টের পরিবেশ রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রোম, পিএইচ এবং ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজ মানদণ্ডের মধ্যে থাকলেও বিওডি, টিএসএস ও ক্লোরাইড মানদণ্ডের বাইরে রয়েছে। বিওডির মাত্রা যেখানে আদর্শ ৩০ হওয়া উচিত, সেখানে পাওয়া গেছে ৩০৮। টিএসএসের আদর্শ মান ১০০ হলেও পাওয়া গেছে ১৬২। ক্লোরাইডের মাত্রা ২ হাজার থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৪১০০। সিইটিপির ডিজাইন্ড ক্যাপাসিটি দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও বাস্তবে সর্বোচ্চ ১৪ থেকে ১৭ হাজার ঘনমিটার পাওয়া গেছে। ঈদুল আজহা পরবর্তী সময়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার ইফ্লুয়েন্ট প্রবেশ করে, যা সিইটিপির ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে নদীতে দূষিত পানি যাচ্ছে। এছাড়া সিইটিপির অধিকাংশ যন্ত্রপাতি আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় বারবার নষ্ট হচ্ছে। জানা যায়, সরকার ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ট্যানারি তা করেছে। বাকি চারটি আর্থিক সংকটের কারণে করতে পারেনি। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, ফান্ডের অভাবে তারা নিজস্ব ইটিপি করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংককে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এদিকে, এসব সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। ইউরোপ-আমেরিকার বড় ক্রেতারা এখন বাংলাদেশের চামড়া কিনছে না। কারণ, এখানে খডএ (খবধঃযবৎ ডড়ৎশরহম এৎড়ঁঢ়) সার্টিফিকেশন নেই। দেশে মাত্র আটটি ট্যানারি এই সনদ পেয়েছে। অথচ সাভারের শিল্পনগরীতে মাত্র একটি ট্যানারি এই সনদ অর্জন করতে পেরেছে। ফলে রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। চামড়া শিল্পের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক প্রভাবও ফেলছে। কোরবানির ঈদে সংগৃহীত কাঁচা চামড়া অনেক জায়গায় বিক্রি হয়নি, কোথাও আবার অতি কম দামে বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছেন। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে গেছে। একসময় লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ছিল এই শিল্পে, এখন অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। এদিকে, চামড়া শিল্পের অব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশ দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। মাছ মারা যাচ্ছে, কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, চামড়ার ভালো দাম নেই, কিন্তু দূষণের কষ্ট আছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, এভাবে চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে পড়বে। সরকার কঠিন বর্জ্য কমাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কাঁচা চামড়ার কাটিং রপ্তানিতে সাত প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বর্জ্যের দাম বেড়েছে, ফলে আর তা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলতে হচ্ছে না। কঠিন বর্জ্য থেকে জেলাটিন ও শিল্প প্রোটিন উৎপাদন শুরু হয়েছে। চীনা একটি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। তবে মূল সংকট রয়ে গেছে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। সিইটিপি শতভাগ সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক মান পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এলডব্লিউজি সনদ পেতে হলে সিইটিপি ও সলিড ওয়েস্টে ৩০০ নম্বর প্রয়োজন। কিন্তু সিইটিপি ও সলিড ওয়েস্টেজ ব্যবস্থাও দেশে এই সনদ পাওয়ার মতো গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প অব্যবস্থাপনা, দূষণ ও নীতিগত ব্যর্থতায় ধ্বংসের পথে। যদি দ্রুত সংস্কার না হয়, তবে এই শিল্প শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের জন্যও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।