থমকে রয়েছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের কাজ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
থমকে রয়েছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের কাজ

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি বহু বছর ধরে থমকে আছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (খড়ঈ) থেকে আসার কথা ছিল ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ ও নকশা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পরামর্শক নিয়োগ দেয় এবং ২০২৩ সালের জুনে নকশা চূড়ান্ত করে। এরপর মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদের আর অল্প কয়েক মাস থাকলেও প্রকল্পের অগ্রগতি বলতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা এবং জমির বড় অংশ অধিগ্রহণই হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত এ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে একটি প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। নতুন প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ খুবই জরুরি। এ রুট হবে রেলের জন্য দ্রুত সেবা ও সাশ্রয়ের। শুরু থেকেই ডাবল লাইন নির্মাণের দাবি ছিল। ডাবল লাইন হলে ব্যয় কিছুটা বাড়লেও প্রায় অর্ধশত ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। এটি হবে রেলের সবচেয়ে লাভজনক রুট। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) নাজমুল ইসলাম বলেছেন, আয় বাড়াতে হলে অবশ্যই ডাবল লাইন নির্মাণ করতে হবে। পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন জানিয়েছেন, বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। নতুন পরিকল্পনায় করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি মেজর ব্রিজ, ২৫টি মাইনর ব্রিজ, ৯১টি বক্স কালভার্ট, একটি রোড ওভারপাস, একটি রেল ফ্লাইওভার এবং একটি রোড আন্ডারপাস নির্মাণের কথা রয়েছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাট- এই আটটি নতুন স্টেশন তৈরি হবে। ১১টি স্টেশনে আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপন করা হবে। এই রেলপথ নির্মাণ হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে বগুড়া থেকে রাজধানী বা দক্ষিণাঞ্চলে যেতে হলে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়। সিরাজগঞ্জ হয়ে সরাসরি সংযোগ তৈরি হলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। ঢাকা থেকে বগুড়া যাত্রায় সময় কমবে চার ঘণ্টার বেশি। কৃষি ও শিল্পপণ্য দ্রুত রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে। উত্তরবঙ্গের আট জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। তবে প্রকল্পটি এতদিন বিলম্বিত হওয়ার কারণে ব্যয় বেড়েছে, আর্থিক চাপও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে। কারণ জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের কাজ করতে হবে। সর্বশেষ পিডিপিপির ওপর প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা ও সিদ্ধান্ত সূত্রে জানা যায়, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ প্রকল্পে প্রায় ছয় বছর টাকা দেয়নি ভারত। ফলে নতুন করে বিকল্প অর্থায়নে এগিয়ে আসছে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (অওওই) ও আরও কয়েকটি দেশ। রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ রেলপথটি নির্মাণ হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ কম ভাড়া, কম সময়ের মধ্যে রাজধানীতে আসা-যাওয়া করতে পারবে। রুটটি ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ‘আর্থসামাজিক করিডোর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বলেন, রেলপথ নির্মিত হলে অন্তত আটটি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক অগ্রগতি হবে। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, এটি রেলের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্প। আমরা ডাবল লাইন অনুযায়ী জায়গা অধিগ্রহণ করছি। অধিগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিকে যাব। জনগণের প্রত্যাশা, দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে দ্রুত রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হবে। এতে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে