হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে কমছে না যাত্রী হয়রানি ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম | প্রকাশ: ১৪ মার্চ, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে কমছে না যাত্রী হয়রানি ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য

নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমছে না। বরং সেখানে চোরাকারবারিরা আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্ক্যানার মেশিনের ফাঁক গলে অবৈধ মালামাল বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাগেজ মেটাল ডিটেক্টর ও এক্স-রে মেশিনে স্ক্যানের পরও লাগেজ অবশ্যই ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভিআইপি ও ভিভিআইপি শ্রেণির যাত্রীদের লাগেজও বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে স্ক্রিনিং করার কথা বলা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা আরোপ এবং সেই অনুমতির তথ্য সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কোনো নিরাপত্তা ভঙ্গের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বেবিচক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় শাহজালালসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে চিঠি দিয়েছে বেবিচক। এতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, যানবাহন ও পায়ে টহল বৃদ্ধি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ জনবল উপস্থিত রাখতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনুমোদিত যাত্রী ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও প্রস্থানপথে নিরাপত্তা তল্লাশি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রী, কেবিন ব্যাগেজ, কার্গো ও যানবাহনের তল্লাশি জোরদার এবং স্পর্শকাতর এলাকা ও সীমানাপ্রাচীর এলাকায় নিয়মিত নিরাপত্তা টহল পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি, বস্তু বা কার্যকলাপ শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। সিসি ক্যামেরা মনিটরিং সেল ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ইমিগ্রেশন পুলিশকে আরও সক্রিয় হয়ে প্রতিটি যাত্রীর কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ না করার নির্দেশও রয়েছে। তবে এত নির্দেশনা দেওয়ার পরও শাহজালাল বিমানবন্দরে অপরাধ কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে ৪৭টি দেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার যাত্রী শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। এত কড়াকড়ি নিরাপত্তার মধ্যেও বিভিন্ন অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সোনা চোরাচালান থেকে শুরু করে যাত্রীদের লাগেজ চুরির ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

বিমানবন্দরের ক্যানোপি-১ ও ক্যানোপি-২ এলাকায় দালালদের দৌরাত্ম্যও বেড়েছে। বিদেশফেরত সহজ-সরল যাত্রীদের কম ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ট্যাক্সিতে তুলে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরের ভেতরেও সংঘবদ্ধ চক্র ট্রলি থেকে ব্যাগ সরিয়ে নেওয়া বা মোবাইল ফোন চুরির মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

ডিজিটাল ব্যবস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবে ম্যানুয়াল চেকিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমেনি। এতে পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে পড়ছে।

সূত্র আরও জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ইমিগ্রেশন কার্যক্রম তিন মিনিটের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একজন যাত্রীকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটেরও বেশি সময়। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী, দেশি-বিদেশি যাত্রী ও পর্যটক এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে সেখানে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ইমিগ্রেশন বিভাগে যাচাই-বাছাইয়ের নামে অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিক এবং ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আসা যাত্রীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও সমন্বয়হীনতার কারণে বেশ কিছু কাউন্টার বন্ধ থাকে। ফলে একটি কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।

এছাড়া বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের মতে, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ আনসার সদস্য বা পুলিশ দিয়েই দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। তাদের অনেকেরই অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেই।

তবে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের পর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পুরো বিমানবন্দর এলাকাকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নাইট-ভিশন সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া জরাজীর্ণ কাঁটাতারের বেড়া বদলে আরসিসি দেয়াল এবং সেন্সরভিত্তিক শক্তিশালী নিরাপত্তা বেড়া স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিমানবন্দরের ভেতরে অপরাধ দমনে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ প্রশিক্ষিত টিম টহল দেবে। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন ডেস্কে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনতে দ্রুত ‘ই-গেট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে