বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতির সময় অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন প্রয়োগের পরপরই দুই নারী রোগীর মৃত্যু হয়েছে। রোববার (১৫ মার্চ) সকালে হাসপাতালের চতুর্থ তলার নাক, কান ও গলা বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
মারা যাওয়া দুই রোগী হলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ডাবলুগঞ্জ গ্রামের মান্নানের স্ত্রী সেফালী বেগম (৬০) এবং বরিশাল বিমানবন্দর থানার কাশীপুর এলাকার মৃত বাবু হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৫)। হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেফালীর গালে টিউমার এবং হেলেনার থাইরয়েড সমস্যার কারণে তাদের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে অপারেশন হওয়ার কথা থাকলেও তার আগে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় তাদের শরীরে অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন দেওয়া হয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। সেফালী বেগমের মেয়ে খাদিজা আক্তার জানান, দুই রোগী পাশাপাশি বেডে ছিলেন। “প্রথমে আমার মাকে ইনজেকশন দেওয়া হয়, এরপর পাশের রোগীকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মায়ের শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মারা যান।”
অপর রোগী হেলেনা বেগমের ভাই বলেন, “ইনজেকশন দেওয়ার এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যেই আমার বোনের শরীর কালচে হয়ে যায় এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে ডাকাডাকি করলে নার্সরা এসে পরীক্ষা করে জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।”
ঘটনার পর দায়িত্বরত নার্স মলিনা রাণী হালদার বলেন, কীভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তার ভাষায়, “জ্যেষ্ঠ নার্স হেলেন অধিকারী ওষুধ প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। আমি সেটি অনুযায়ী রোগীদের ইনজেকশন দিয়েছি। ২৬ বছরের চাকরি জীবনে এমন ভুল কখনো হয়নি। আমি ক্ষমা চাই।” তবে জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স হেলেন অধিকারী এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এমন কোনো নির্দেশ দেননি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, অস্ত্রোপচারের আগে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সাধারণত অবেদনবিদ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে অচেতন করা হয় এবং পুরো সময় শ্বাসপ্রশ্বাসসহ গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নরকিউ নামে যে ওষুধটি দেওয়া হয়েছিল তার জেনেরিক নাম ভেকুরোনিয়াম ব্রোমাইড। এই ধরনের ওষুধ শরীরে প্রবেশ করলে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি সাময়িকভাবে অচল হয়ে যেতে পারে। এজন্য সাধারণত অপারেশন থিয়েটারে ভেন্টিলেশনসহ প্রয়োজনীয় শ্বাসনালি সহায়তা প্রস্তুত রেখে এটি প্রয়োগ করা হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, অস্ত্রোপচারের আগে কিছু নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু দায়িত্বে থাকা নার্সরা নির্ধারিত সময়ের আগেই ওয়ার্ডে বসে অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন দিয়েছেন। “এতে রোগীর শরীরে এমন পরিবর্তন হয় যা মেশিনের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু সেটি না থাকায় কিছু সময়ের মধ্যে রোগীরা মারা গেছেন। এটি গুরুতর গাফিলতি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
তিনি আরও জানান, সহকারী অধ্যাপক ডা. আমিনুল হককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে।
ঘটনার পর নিহত দুই রোগীর স্বজন ও অন্যান্য রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।