দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবের আগে ভিজিএফ কর্মসূচির চাল অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস হয়ে আসে। কিন্তু সেই চাল যদি প্রকৃত দুস্থদের হাতে না পৌঁছে রাজনৈতিক ভাগাভাগি বা প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়; বরং ন্যায্যতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে। পত্রপত্রিকার প্রকাশিত তথ্য বলছে, লক্ষ্ণীপুরের কমলনগর উপজেলায় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বরাদ্দ ভিজিএফ চাল বিতরণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে প্রায় ৪৫২ টন চাল বিতরণের জন্য ৪৫ হাজারের বেশি কার্ড বরাদ্দ থাকলেও অভিযোগ রয়েছে-এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দল, সংবাদকর্মী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নামে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের অনেকেই এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কার্ড বরাদ্দ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শত শত কার্ড দলীয় কোটায় ভাগ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে যেসব মানুষ দিনমজুরি, রিকশা চালানো বা অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালান, তাদের অনেকেই ভিজিএফের এই সামান্য সহায়তাটুকু থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, কার্ড পাওয়ার জন্য বহু দরিদ্র মানুষ জনপ্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও আশানুরূপ সাড়া পাননি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও চাপের মুখে কার্ড বণ্টনের অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে তারা বাধ্য হয়েছেন এভাবে কার্ড বণ্টন করতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যদি রাজনৈতিক চাপই চূড়ান্ত নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীরা কোথায় দাঁড়াবে? অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কোটা বা ভাগাভাগির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ভিজিএফ কার্ড বণ্টনে কোনো ধরনের কোটা পদ্ধতির সুযোগ নেই এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বণ্টনে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই হলো দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো। তাই এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। উপকারভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ঈদের আগে একটি পরিবারের জন্য ১০ কেজি চাল হয়তো খুব বড় সহায়তা নয়, কিন্তু এটি একটি প্রতীক-রাষ্ট্র তার দুর্বল নাগরিকদের পাশে আছে। সেই প্রতীক যদি রাজনৈতিক ভাগাভাগির মধ্যে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল কিছু দরিদ্র পরিবার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এখন জরুরি।