দেশে ফিরলে শাস্তি পেতে পারেন এমন আশঙ্কায় নারী এশিয়ান কাপের খেলা শেষ হলেও অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় চেয়েছিলেন ইরানের ছয় ফুটবলার ও এক কোচিং স্টাফ। তাদের মধ্য থেকে মত বদলে ৫ জনই দেশে ফিরে গেছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়া দু’জন যোগ দিয়েছেন স্থানীয় ক্লাব ব্রিসবেন রোয়ার-এর অনুশীলনে। অ্যাসাইলাম নেওয়া ইরানি ফুটবলার ফাতেমেহ পাসানদিদেহ ও আতেফেহ রামেজানিসাদেহ’র ছবি এখন আলোচনায়। দুই ফুটবলারের অনুশীলনে যোগ দেওয়ার ছবি নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছে ব্রিসবেন রোয়ার। একই সময়ে ইরানের বাকি ফুটবলাররা মালয়েশিয়া থেকে ওমানের উদ্দেশে রওনা দেয়। নারী এশিয়ান কাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ইরানের ফুটবলারদের অস্ট্রেলিয়া সরকার মানবিক ভিসার প্রস্তাব দেয়। যা নিয়ে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শুরুতে সাতজন খেলোয়াড় আশ্রয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করলেও পরে তাদের মধ্যে পাঁচজন সিদ্ধান্ত বদলে ইরানে ফিরে যাওয়ার কথা জানান। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার নারী ফুটবলের এলিট এ-লিগ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ব্রিসবেন রোয়ার ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছে, ‘ফাতেমেহ ও আতেফেহকে স্বাগতম।’ যেখানে একটি সিংহীর ইমোজিও ব্যবহার করা হয়। যা ইরানি নারী খেলোয়াড়দের পরিচিত নামের প্রতীক। ব্রিসবেন রোয়ার ক্লাবের প্রধান নির্বাহী কাজ পাটাফটা লিখেছেন, ‘তারা যখন পরবর্তী ধাপ সামলাচ্ছে, তখন আমরা তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ দুই ফুটবলারই ওই পোস্টে মন্তব্য করেছেন। রামেজানিসাদেহ লেখেন, ‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’ ইরানি দুই ফুটবলারকে নিয়ে অবশ্য ক্লাবটি আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একইসঙ্গে সব প্রশ্ন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর আগে এক বিবৃতিতে ব্রিসবেন রোয়ার জানিয়েছিল, তারা এই দুই ফুটবলারকে অনুশীলন, খেলা ও নিজেদের জায়গা খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দিতে প্রস্তুত। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, তাদের একটি গোপন-নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তারা সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবে এখনও কোনো সাক্ষাৎকার দেননি ফাতেমেহ-আতেফেহ। তবে গত সোমবার পাসানদিদেহ ইনস্টাগ্রামে ফিফার চিফ ফুটবল অফিসার জিল এলিসের সঙ্গে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ ইরান ফুটবল দলের বাকি সদস্যরা সোমবার রাতে কুয়ালালামপুর থেকে ওমানের উদ্দেশে রওনা দেন। তাদের যাত্রা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) জেনারেল সেক্রেটারি উইন্ডসর জন জানান, ইরানের দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় এই যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। এএফসি ও ফিফা নিয়মিতভাবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের মাধ্যমে তাদের খোঁজখবর নেবে। কারণ তারা আমাদের মেয়ের মতোই। এর আগে টুর্নামেন্ট খেলতে ইরানের নারী দল অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর জানতে পারে ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়েছে। যেখানে প্রাণ হারান দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর এশিয়ান কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত চলাকালে নীরব থাকেন ইরানি ফুটবলাররা। এই নীরবতাকে কেউ প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ শোক প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ফুটবলাররা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেননি এবং পরবর্তী দুই ম্যাচে তারা সংগীত তো গেয়েছেন-ই, পাশাপাশি সামরিক স্যালুটও দিতে দেখা যায়। প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত না গাওয়ায় ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের এক উপস্থাপক ফুটবলারদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে শাস্তি পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইরানি নাগরিকরা বিক্ষোভে নামেন এবং খেলোয়াড়দের দেশে না ফিরে সেখানেই আশ্রয়ের দাবি তোলে। মার্কিন প্রেসিডেন্টও তাদের আশ্রয় দেওয়ার নির্দেশনা দেন অস্ট্রেলিয়াকে। সে অনুসারে সরকারের প্রতিনিধিরা প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বিমানবন্দরে আলাদা বৈঠক করেন এবং শুরুতে ছয়জন খেলোয়াড় ও একজন কর্মকর্তা রাজি হন সেই প্রস্তাবে। তাদের সতীর্থরা যখন ১০ মার্চ সিডনি থেকে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান, কয়েকদিনের মাঝে আশ্রয় চাওয়া পাঁচজনও মত পরিবর্তন করে ইরান দলের সঙ্গে যোগ দেন। যদিও তারা এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ জানায়নি। তবে অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যম জানায়- তেহরানের চাপের মুখে তারা এমনটি করতে পারেন।