অদম্য ইচ্ছায় কৃষকের ছেলে আরমান বিসিএসের এএসপি হলেন

এফএনএস (আমিনুল হক সাদি; কিশোরগঞ্জ) : | প্রকাশ: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম
অদম্য ইচ্ছায় কৃষকের ছেলে আরমান বিসিএসের এএসপি হলেন

অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন আরমান মোস্তাফিজ। তবে সত্যিকার অর্থে বড় হতে দৃঢ ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমে ছিলেন অটুট। সেই শক্তিই তাকে এনে দিয়েছে সর্বোচ্চ সাফল্য। ৪৬ তম বিসিএসে সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। বাবা মায়ের দোয়া কঠোর অধ্যাবসা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়েছেন বিসিএস ক্যাডার। বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক সমপ্রতি প্রকাশিত ৪৬ তম বিসিএসের চূডান্ত ফলাফলে পুলিশের এএসপি (সুপারিশ প্রাপ্ত) হয়েছেন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের আরমান মোস্তাফিজ। তিনি স্থানীয় প্রয়াত কৃষক মো: ইলিয়াস মিয়ার ছেলে। মোস্তাফিজ নিজ গ্রামের এডুকেশন কেয়ার প্রি ক্যাডেট স্কুলে প্রথম শেণিতে ভর্তি হয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে মহিনন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০১৩ সালে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫, ২০১৫ সালে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে (২০১৫-১৬)   সেশনে বিবিএ এবং (২০১৯) সালে (সিজিপিএ ৩.২৯) এবং ২০২০ সালে এমবিএ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় (সিজিপিএ ৩.৪৮)  পেয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ৪৩তম বিসিএস ক্যাডারে তিনি সদরপুর সরকারি কলেজে প্রভাষক (ব্যবস্থাপনা) চাকুরী জীবন শুরু করেন। আবেগে আপ্লত হয়ে আরমান মোস্তাফিজ বলেন, ছোটবেলা থেকে আমার বাবা ইলিয়াস মিয়া,মা মদিনা খাতুন পড়াশোনার জন্য খুবই সচেতন ছিলেন, যদিও উনারা নিজেরা তেমন পড়াশোনা করেননি। ছোটবেলা থেকে আমি পড়াশোনা, খেলাধুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। আমার বড় চাচা বিভিন্ন সময় আমাকে পড়াশোনা নিয়ে উপদেশমূলক কথাবার্তা বলতেন যা আমি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। আমার বাবা কিশোরগঞ্জ রেকর্ড রুমে অস্থায়ী চাকরি করতেন, সাথে কৃষি জমিতে কাজ করতেন। বাবা ছোটবেলা হতে বিসিএস দিতে হবে বলতেন এবং আমিও শুনতাম। তিনি বলতেন " বিসিএস ক্যাডার হলে নাকি অনেক সম্মান, সবাই স্যার স্যার বলে ডাকে"। আমিও ভাবতাম যে আমিও হবো একদিন ইনশাআল্লাহ। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো করার পর আমার বাবা ইচ্ছে পোষণ করলেন আমি যেন পুলিশ ক্যাডারের জন্য চেষ্টা করি, কেন জানি উনি ম্যাজিস্ট্রেট হতে বলতেন না। তারপর আমিও বিবিএ শেষে বিসিএসে আবেদন করি পুলিশ প্রথম চয়েস দিয়ে। ১ম চেষ্টা হিসেবে ৪১তম বিসিএস এপিয়ার্ড দিয়ে আবেদন করে পরীক্ষা দেই, কিন্তু প্রিলিমিনারি ফেইল। তারপর ৪৩ তম বিসিএস প্রিলি পাশ করে প্রথম কলটাই আমার আব্বাকে দিই, কি যে খুশি! তারপর থেকে বিসিএস- এর আর কোন ফলাফল আমার বাবাকে আর জানাতে পারিনি। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যাবেন ভাবিনি। আমি ১ মাস ডাক্তারের ট্রিটমেন্টে ছিলাম, এতটাই হতাশায়-কষ্টে পড়ে গিয়েছিলাম বাবাকে হারিয়ে যে বাবা নেই এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার মা মদিনা খাতুন ভাই সিফাত আহম্মেদ ধীমান, রিয়াদুল হাসান রোমান, বোন শামীমা আক্তার হেমি, শিউলী আক্তার, স্ত্রী আফরোজা সুলতানা সায়মা, ছোট মামা সবাই আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, সাথে বন্ধুরা তো ছিলই। তারপর আবার ঢাকায় ফেরত। কিন্তু হাতে টাকা নেই, কারণ বাবার অস্থায়ী চাকরি থাকায় কিছুই পাইনি। বাবার কিছু জমি রেখে গিয়েছেন যা আমি বিক্রি করতে চাইনি কারণ মানুষটা আমাদের শুধু দিয়েই গেলো,নিজে কিছুই ভোগ করলো না। কত কষ্ট করেছেন আমাদের জন্য তা আমরা দেখেছি। নিজে কষ্ট করতেন কিন্তু আমাদের বুঝতে দিতেন না। তাই জমি বাবার স্মৃতি হিসেবে বিক্রি না করে রাখার পরিকল্পনা করলাম। যেহেতু ঐদিকে আমার বাবার প্রিয় ও বিশ্বস্ত মানুষ আমার ছোট মামা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন " আমি তো আছি তোরা পড় "। আমি এই সাপোর্ট না পেলে হয়তো সংসার চালাতে প্রাইভেট চাকরি করতাম অথবা জমি বিক্রি করতে হতো যেহেতু আমরা চার ভাই-বোন তখনও পড়াশোনা করছি, বড় আপার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আমিও এই সুযোগ পেয়ে আর হাল ছাড়িনি, মনে হলো এটাই আমার শেষ সুযোগ। ভাবলাম বাবাকে তো কিছুই দিতে পারিনি, বাবার ইচ্ছেটা পূরণ করে কিছুটা শান্তি পেতে চাই। ৪৩তম বিসিএসে শিক্ষা, ৪৪তম বিসিএসে পুনরায় শিক্ষা, ৪৫তম বিসিএসে ভাইভা দিয়ে খালি হাতে ফিরলাম। পরে ৪৬তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপাশিপ্রাপ্ত হই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে