ঈদেও ছুটে নেই তাঁদের

এফএনএস (মেহেদী হাসান মাসুদ, রাজবাড়ী) : | প্রকাশ: ২১ মার্চ, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
ঈদেও ছুটে নেই তাঁদের

আল আমিন রাজবাড়ীর একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। বড় মেয়ের বয়স আট বছর, আর ছোটটির মাত্র আড়াই বছর। ঈদের দিনে বাবাকে কাছে পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে ছিল দুই শিশুকন্যা। বৃদ্ধ মা-বাবাও অপেক্ষা করছিলেন-ছেলে বাড়ি ফিরবে, একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়বেন, খাওয়া-দাওয়া করবেন। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের কারণে সেই অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। ঈদের দিনেও বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না আল আমিনের। সকালে মাঠে টহল দেওয়া, মসজিদ চত্বরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাজার এলাকায় নজরদারি-এসব দায়িত্বই এখন তার প্রধান কাজ। এর সঙ্গে রয়েছে জরুরি ফোনে সার্বক্ষণিক সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব, যেখানে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ ফেরানোর সুযোগ নেই। পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ না থাকলেও দায়িত্বের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইল ফোনেই সন্তানের মুখ দেখা, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা এবং স্ত্রীর সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে ঈদের আনন্দ।

আল আমিনের মতো রাজবাড়ীর আরও অসংখ্য পুলিশ সদস্য এবার ঈদ কাটাচ্ছেন পরিবার থেকে দূরে থেকে। জেলা পুলিশের অধীনে থাকা ৫টি থানা, ৩টি তদন্ত কেন্দ্র ও ১টি পুলিশ ফাঁড়িতে মোট ৮৪৫ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ৫৪৯ জন ঈদের সময় কর্মস্থলে থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন। তারা টহল দিচ্ছেন, জরুরি কলের সাড়া দিচ্ছেন, দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ছুটে যাচ্ছেন। একটাই লক্ষ্য-সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ঈদ উদযাপন করতে পারে। থানার ডিউটি রুমেও ব্যস্ততা কমে না। কোথাও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতির খবর পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। কন্ট্রোল রুমে থাকা তথ্য অনুযায়ী ওসি ও পুলিশ সুপার সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।

শরীয়তপুরের পুলিশ সদস্য শাহ আলম বলেছেন, ঈদের দিনেও অন্য দিনের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এখন বাড়ি না গিয়ে কয়েকদিন পর গেলে তখনই ঈদের আনন্দ অনুভব করবেন বলে মনে করেন তিনি। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি থানায় ৬০ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৯ জন পরিবার নিয়ে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পেয়েছেন। বাকি ৪১ জন দায়িত্বে থেকেই মানুষের ঈদ নির্বিঘ্ন করতে কাজ করছেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রব বলেছেন, ঈদের সময় সবাই স্বজনদের কাছে ফিরতে চায়, কিন্তু পুলিশের দায়িত্ব হলো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই বেশিরভাগ সদস্যকেই ঈদের দিনেও দায়িত্ব পালন করতে হয়।

গোয়ালন্দ ঘাট থানার ৫৮ জন সদস্যের মধ্যে ৪৮ জনই ঈদের দিন দায়িত্বে থাকবেন। ওসি মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, তাদের কাছে ঈদ মানেই দায়িত্ব পালন এবং মানুষের শান্তিপূর্ণ উৎসব নিশ্চিত করা। এই পুলিশ সদস্যদের ঈদ অনেকটাই ভিন্ন। তারা মাঠে, রাস্তায়, মসজিদে, বাজারে দায়িত্ব পালন করেন, আর তাদের পরিবার দূরে বসে অপেক্ষা করে। এ যেন সেই বাতিওয়ালা, যিনি অন্যের ঘর আলোকিত করেন, অথচ নিজের ঘরই অন্ধকারে রেখে যান।

রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বিপিএম-সেবা বলেন, আমরা যখন পুলিশে যোগ দিই, তখনই বুঝে নিই এই পেশার দায়িত্ব অন্য সবার চেয়ে আলাদা। পূজা-পার্বণ বা যেকোনো উৎসবের সময় আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়, আর সেটি আমরা মানসিকভাবেই মেনে নিই।

তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকা নিঃসন্দেহে কষ্টের। ঈদ বা উৎসবের যে আবেগ, যে পারিবারিক উষ্ণতা সেটা দায়িত্বের কারণে অনেক সময় অনুভব করার সুযোগ থাকে না। পুলিশের চাকরিতে সেই আনন্দের আমেজটা অনেকটাই ভিন্ন হয়ে যায়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের এই ত্যাগের পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য থাকে হাজার হাজার মানুষ যেন নির্বিঘ্নে তাদের উৎসব উদযাপন করতে পারে। সেই লক্ষ্যেই আমরা সব কষ্ট, সব অভাব হাসিমুখে মেনে নিই।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে