আজ বিশ্ব পানি দিবস, তীব্র খাবার পানির সংকটে ভুগছে কয়রাবাসী

এফএনএস (মোঃ রিয়াছাদ আলী; কয়রা, খুলনা) : | প্রকাশ: ২২ মার্চ, ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
আজ বিশ্ব পানি দিবস, তীব্র খাবার পানির সংকটে ভুগছে কয়রাবাসী

সকালে ঘুম থেকে উঠেই ৪ কিঃ মিঃ দুরের একটি সরকারি পুকুর হতে পানি সংগ্রহ করে সেই পান করতে হয়। প্রতিদিন ২/৩ বার পানি আনতে গিয়ে দিনের অন্য কাজ করতে সমস্যা হয়। এমন কথা গুলো বলছিলেন কয়রা উপজেলা প্রত্যন্ত জনপদ ৬নং কয়রা গ্রামের আদিবাসী নারী বাসন্তী মুন্ডা। তাদের পুকুরের পানিই একমাত্র ভরসা। শুধু বাসন্তী নয় এমন সমস্যা কয়রা উপজেলার ৭ টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার। নদী বেষ্ঠিত এ জনপদরর চারিদিকে পানির সমহার থাকলেও নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। শুকনো মৌসুম এলেই দেখা দেয় খাবার পানির সংকট। পুকুরগুলো খাবার পানির একমাত্র অবলম্বন থাকলেও অনেক পুকুরে শুকুয়ে যাওয়ায় দুরদুরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে মানুষদের। কিছু অংশে গভীর নলকুপের পানি পান করলেও পানির আধার স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে ঐ এলাকার বাসিন্দাদের।

লবণাক্ত নদী, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন আর জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়া এই বাস্তবতার মাঝেই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ কয়রা উপজেলা আজ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে হাঁসফাঁস করছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে কার্যকর সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই; বাকি দুই ইউনিয়নেও রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি। ফলে প্রতিদিনের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে লড়াই করতে হচ্ছে প্রায় দুই লাখ মানুষকে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, খুলনার কয়রা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২,২০,১০২ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কম নয়। ১৪১ টি প্রাথমিকবিদ্যালয়, ৪টি কলেজ, ৩৮টি হাইস্কুল, ২টি কামিল মাদ্রাসা, ৪টি আলিম মাদ্রাসা ও ২১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার আমাদী, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর  ইউনিয়নের কিছু অংশে পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। এসব ইউনিয়নে অধিকাংশ নলকূপ অকার্যকর; কোথাও নলকূপ নেই বললেই চলে।  এ ছাড়া কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের অনেক এলাকাতেও একই চিত্র। কিছু জায়গায় ডিপ টিউবওয়েল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে খাওয়ার উপযোগী পানি হিসেবে অনেকেই পুকুরের পানির ওপর নির্ভর করছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে পানির সংকট রয়েছে পাথরখালীতে। 

স্থানীয়রা বলছে সব মিলিয়ে কয়রার অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। মিঠাপানির অভাবে গৃহপালিত পশু পালনও ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। আমাদী ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামে দেখা গেছে একমাত্র মিঠা পানির টিউবওয়েল ঘিরে দীর্ঘ লাইন। বামনডাঙ্গা, দশবাড়িয়া, খেওনা, খিরোল, বালিয়াডাঙ্গা ও পাটুরিয়া- এই ছয় গ্রামের শত শত পরিবার বিকাল হলেই কলস হাতে ভিড় করেন। একটি কলস পানি তুলতে সময় লাগে পাঁচ থেকে দশ মিনিট। গরমের সময় পানির স্তর নেমে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফেরে। ঐ গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজা খাতুন বলেন, আমাদের এখানে মিঠাপানির জলাশয় বা পুকুর-টিউবওয়েল কোনোটাই নাই। শুধু একটা টিউবওয়েল, সেখান থেকেও ঠিকমতো পানি ওঠে না। একটা কলস ভরতে পাঁচ-দশ মিনিট লাগে। শুকনো মৌসুমে পানি ওঠে না। সরকারি একটা পানির প্ল্যান হলে আমরা একটু খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম। ৫নং কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আঃ হামিদ সরদার বলেন, তাদের প্রতিদিন ভ্যানযোগে কয়রা সদর হতে ড্রামের মাধ্যমে পানি আনতে হয়। প্রতি ড্রামে খরচ হয় ২০/২৫ টাকা। সেই পানি পান করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ী গ্রামের আঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, ডিপ টিউবওয়েল থেকেও লবণাক্ত পানি ওঠে। লবণাক্ত পানি খেয়ে নানা সমস্যায় পড়ি। তিন-চার কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। আমাদের এখানে মিঠাপানির ব্যবস্থা করলে অনেক উপকার হতো। কয়রা উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুজ্জামান মনু  বলেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে পুকুর খনন করে পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন টেকসই সমাধান হতে পারে। তবে শুধু স্থাপন করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পলিমার ট্যাংকি বিতরনে কিছুটা লাঘব হতে পানি খাবার পানির সমস্যা হতে। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইস্তিয়াক আহমেদ বলেন, কয়রা উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ডিপ টিউবওয়েলেও লবণাক্ত পানি ওঠে। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধাপে ডিপ টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক বিতরণ কার্যক্রম চলমান। আশা করি এক-দুই বছরের মধ্যে পানি সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে। কয়রার সচেতন মহলেন দাবি, খণ্ডকালীন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন বৃহৎ আকারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খনন, পিএসএফ স্থাপন এবং কঠোর তদারকি। অন্যথায় বিশুদ্ধ পানির অভাব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হবে এবং পশুপালনসহ স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কয়রার বিস্তীর্ণ জনপদে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া, একটু মিঠাপানি। উন্নয়ন পরিকল্পনার কাগজে নয়, বাস্তবের কলস ভরে সেই পানির নিশ্চয়তা চায় উপকূলের মানুষ।