ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে ছেলের স্বপ্নপূরণে গরু গাড়ি নিয়ে বিয়ে করলেন মেহেদি হাছান নামে এক যুবক। আবহমান গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া বাহনটিতে চড়ে বিয়ে করতে গেলে হাজারো মানুষ এক নজর দেখতে ভিড় করে রাস্তার দু’পাশে।কালীগঞ্জ উপজেলার আড়ুয়াসড়ুয়া গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে মেহেদি হাছানের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় পাশ্ববর্তী চাপরাইল গ্রামের হাফিজুর রহমারে মেয়ে রাবেয়া খাতুনের। সোমবার ছিল তাদের বিয়ের দিন। বর মেহেদি হাছানের ইচ্ছা ছিল বর বেশে গরুর গাড়িতে করে বরযাত্রী নিয়ে কনের বাড়িতে বিয়ে করতে যাবে।নতুন বউ আসবে গরু গাড়িতে। বরের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গরু গাড়িতে করে বরযাত্রী নিয়ে বর বেশে কনের বাড়িতে বিয়ে করতে যান মেহেদি। গ্রাম বাংলার হরিয়ে যাওয়া টাপুর যুক্ত গরু গাড়ি দেখতে শত শত নারী পুরুষ ভিড় জমান বর ও কনের বাড়িতে। রাস্তায় অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে গরু গাড়িতে বরযাত্রার দৃশ্য অবলোকন করেন। এমন আয়োজনে খুশি বর কনের পরিবারসহ এলাকাবাসী। গ্রাম বাংলার এ পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এলাকার অনেকে।বর ও কনের বাড়ির দূরত্ব মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের পথ হলেও, সেই স্বল্প দূরত্ব পাড়ি দিতেই বেছে নেওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী গরু গাড়ির বহর।সোমবার দুপুরে সাজানো-গোছানো ৭টি গরু গাড়িতে করে বরসহ বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে পৌঁছান। রঙিন কাপড়, ফুল ও গ্রামীন অলংকরণে সাজানো এসব গাড়ি দেখতে আশপাশের গ্রামের নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীসহ সব বয়সী মানুষের ভিড় জমে। বর মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় আমরা ভেবেছি বিয়েটাকে একটু ভিন্নভাবে স্মরণীয় করে তোলা যায়। সেই ভাবনা থেকেই গরু গাড়ির এই আয়োজন। এটি আমাদের গ্রামীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখারও একটি ছোট্ট চেষ্টা।স্থানীয় যুবক তুষার আহম্মেদ বলেন,বড়দের মুখে গরু গাড়িতে বিয়ের গল্প শুনেছি, কিন্তু সরাসরি কখনো দেখিনি।আমি আজ নিজের চোখে দেখে খুব ভালো লাগছে।পুরো পরিবেশটাই ছিল উৎসবমুখর।বউ চলেছে বাপের বাড়ি, গাঁয়ের পথে গরু গাড়ি। গাড়ির উপর আছে ছই, বউয়ের সাথে যাবে সই। কবিতার লাইন গুলো কিছু কাল আগে বাস্তব ছিল। কিন্তু এমন দৃশ্য এখন অবাস্তব ব্যাপার। শহর তো দূরের কথা গ্রামাঞ্চলেও এখন গরুর গাড়ির দেখা পাওয়া দুষ্কর।এমন এক সময় ছিল যখন গ্রাম-গঞ্জের মানুষের একমাত্র বাহন ছিল গরুর গাড়ি। সেটি খুব বেশি সময় আগের কথা নয়। ২০/২৫ বছর আগে এইসব গরুর গাড়ির কদর ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এখন কালের আবর্তন ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই গাড়ি। সেই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গাড়ি ও চাকা তৈরির পেশা।মোটর সাইকেল,রিকশা-অটোরিকশা,মাইক্রো,বাস,প্রাইভেট, টেম্পু, থ্রি-হুইলারের মতো দ্রুত গতির যানবহন গুলো এখন সেই জায়গা দখল করেছে। গরুর গাড়িতে এল বর কনে। এ দৃশ্য দেখেনি আজকের প্রজন্ম গরুর গাড়িদূরে থাক,পালকিতে বউ যাওয়ার কথা পড়েছে, কিন্তু দেখেনি তারা। এখন বর-কনে আসে চারচাকা গাড়িতে। যার যত বেশি সামর্থ, তার বিয়ের গাড়ি তত দামি। কিন্তু সেই নতুনের মাঝে পুরনোকে যদি ফিরে পাওয়া যায় তবে কেমন হয় সেই পুরনো রীতি নতুন করে ছুয়ে দেখা গেলেগুরর গাড়িতে বিয়ে।পুরনো রীতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বর ও নববধু দু,জন মিলেই।বর ও বধু বলছেন এখন যুগ বদলেছে, কিন্তু আমাদের শিকড় এখন ও গ্রামেই। তাই ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে আমরা গরুর গাড়িতে বিয়ে করেছি।আমরা এমন কিছু করতে পেরে খুব ভাল লাগছে। এটা আমাদের পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। এলাকার বাসিন্দারা ছোট-বড় সকলেই সেই বিরল মুহূর্তের স্বাক্ষী হতে রাস্তায় ভিড় জমান। মোবাইল ফোনে সেই ছবিও বন্দি করেন অনেকেই। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন অনুপ্রেরনা জোগাবে বলে তারা মনে করেন।