গণঅভ্যুত্থান ও দায়মুক্তি

আইনি সুরক্ষা নাকি জবাবদিহির প্রশ্ন?

এফএনএস
| আপডেট: ২৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম | প্রকাশ: ২৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
আইনি সুরক্ষা নাকি জবাবদিহির প্রশ্ন?

গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ’ হুবহু বিল আকারে সংসদে পাসের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নতুন করে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে এই সিদ্ধান্তকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুরক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো মামলা দায়েরের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি “বীর যোদ্ধাদের”সুরক্ষা দেওয়ার নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতিফলন। বিশেষ কমিটিতেও এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে-সর্বজনীন দায়মুক্তি কি ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? গণআন্দোলন বা অভ্যুত্থান যাই হোক না কেন, সেখানে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধ বা অনিয়মের দায় সম্পূর্ণভাবে মুছে দেওয়া হলে তা আইনের শাসনের মূলনীতির সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে গণভবনে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ দেবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরবে। তবে ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান ও জনআকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। সরকারপক্ষ সংবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও, বিরোধী মতামতে প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে। এই দ্বৈত অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এছাড়া একই বৈঠকে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর মতো বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যা দেখায় যে সংসদীয় কমিটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন নিয়ে কাজ করছে। তবে গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত দায়মুক্তির বিষয়টি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে স্পর্শকাতর। গণঅভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে প্রয়োজন-যেখানে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। অন্যথায়, তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমাধান ভবিষ্যতে আরও জটিল আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।