তৃতীয় দফা আলোচনা শেষ হতে না হতেই ইসরাইলের কুচক্রী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কু-প্ররোচনায় “চিটো শয়তান” (ঈযববঃড় ঝধঃধহ) নামে কুখ্যাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথভাবে অপারেশন “এপিক ফিউরি” (ঊঢ়রপ ঋঁৎু) নামে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইরানের উপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ আলোচনার মধ্যস্থতাকারীই আলোচনা চলবে বলে জানিয়েছিলেন। এটি নিশ্চিত করেন আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাথন পাওয়েল। ইসরাইলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তথ্য অনুযায়ী আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান, ইরানি বিপ্লবী গার্ড কোরের প্রধানসহ শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রায় ৪ ডজন নেতাকে মিসাইল আক্রমণে হত্যা করে এবং একই সঙ্গে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরে বোমা হামলা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭০ জন মেয়ে শিশুকে হত্যা করে। এভাবেই শুরু হয় মার্কিন-ইসরাইলি বহু প্রতীক্ষিত, পরিকল্পিত ও কাঙ্ক্ষিত একতরফা যুদ্ধ। এটা কি যুদ্ধ, না সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিস্ট আক্রমণ, যা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী! কয়েক মাসের হুমকি-ধমকির মাঝেই চলছিল প্রস্তুতি। ইরান আলোচনায় বসেছিল পরমাণু কার্যক্রমে ছাড় দিয়ে হলেও শান্তির পথে এগোতে। কিন্তু এসবই ছিল মার্কিন-ইসরাইলি চক্রের সময়ক্ষেপণ এবং অন্তরালে প্রস্তুতি। ইরান বলেছিল, আঘাত পেলে প্রত্যাঘাত করতে পিছপা হবে না। তাই হয়েছে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান প্রত্যুত্তরে প্রচণ্ড হামলা করেছে ইসরাইলের ভূখণ্ডে ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে। খামেনীর হত্যার বদলে মিসাইলের আঘাতে নেতানিয়াহু, তার ভাই ও সঙ্গী নেতাদের ইরান ওপারে প্রেরণ করে। চলতে থাকে আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ। প্রায় এক মাসের যুদ্ধে সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে ইরানে, ইসরাইলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে। অনেক সেনা স্থাপনা ও যুদ্ধাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে, উভয় পক্ষে হাজার হাজার সেনা ও সাধারণ জনগণের মৃত্যু হয় এই আগ্রাসী যুদ্ধে। কিন্তু সমগ্র পশ্চিমা মিডিয়া ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের পক্ষে হতাহত ও ধ্বংসের সঠিক খবর প্রকাশিত হয় না। ওদিকে সেন্সরও দেওয়া আছে। খামেনীদের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও নেতানিয়াহুদের মৃত্যুর সংবাদ ধোঁয়াশায় আবৃত। প্রায় দুই সপ্তাহ পরে দেখা গেল ইসরাইলের উপ-প্রধানমন্ত্রীকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছে। ওদিকে উভয় পক্ষের তেল শোধনাগার, গ্যাসক্ষেত্র ও পানি শোধনাগার সবই ধ্বংসের মুখে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী অবরোধ বা বন্ধ করাতে জ্বালানির মূল্য হু হু করে বাড়ছে। বিশ্বময় এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। ইরানের অভূতপূর্ব ও চমক লাগানো প্রতিরোধে বেসামাল হয়ে পড়েছে এবং অস্বস্তিতে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। আমেরিকার সঙ্গে সমান তালে টেক্কা দিয়ে ইরান চিন্তায় ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে। ইউরোপীয় মিত্রদের এবং মধ্যপ্রাচ্যের আক্রান্ত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে সামিল হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিণাম ৩য় বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক এই আগ্রাসী যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হচ্ছে না। আলোচনার প্রস্তাব দিলে ইরান দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছে। গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়েছে ট্রাম্প সাহেব, যাকে আমরা মাইনকার চিপাও বলি। ইরানকে ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই সর্বাত্মক আক্রমণ করার জন্য উভচর নৌজাহাজের মাধ্যমে হাজার হাজার সৈন্য ইরানে প্রেরণের চেষ্টা করছে। কতটুকু সফল হবে এই আত্মবিশ্বাসী ও জিহাদি মনোভাবাপন্ন ইরানের বিরুদ্ধে, তা ভবিতব্য। হয়তো ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই অভিলাষ বাস্তবায়িত হবে না এবং ইরানের হাত ধরেই আমেরিকার মোড়লিপনার ইতি বা পতন ঘটবে। আবার এমনও হতে পারে যে, ইরানকে ধ্বংস করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। কিন্তু ইরান ভাঙবে, তবু মচকাবে না।
পটভূমি
বিশ্ব মানচিত্রে ও ভূরাজনীতিতে এখন যুক্তরাষ্ট্র মোড়ল বা গডফাদার, আর ইসরাইল বিশ্ব মাস্তান ও একটি অবৈধ সন্ত্রাসী ইহুদি রাষ্ট্র। ইসরাইল ১৯৪৮ সালে ব্রিটেন এবং আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের মদদে আশ্রয়দাতা ফিলিস্তিনে জোরপূর্বক যাযাবর ইহুদি রিফিউজিদের রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম হয় এবং ফিলিস্তিনিরা নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত হয়, অর্থাৎ আশ্রয়দাতারাই নিজেরাই রিফিউজি বা শরণার্থী হয়ে যায়। ফিলিস্তিনিরাও সেই থেকে আজ পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধরত। এ নিয়ে একাধিক আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সরাসরি মার্কিন ও পশ্চিমা সক্রিয় সাহায্যে ইসরাইল রাষ্ট্র ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। পশ্চিম তীর, গোলান হাইটস এবং গাজা তারা কবজা করেছে। লেগেই আছে ইসরাইলি বর্বরতা আর ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইন লঙ্ঘন করে ইসরাইল লেবাননে স্থলযুদ্ধে সাদা ফসফরাস ছড়াচ্ছে। বসতি এলাকায় এই ফসফরাস অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা পোড়াতে পারে। শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত নিজেদের ভূমি উদ্ধারে সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে মিশর ও সিরিয়া যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সরাসরি সাহায্যের কারণে ইসরাইল জয়ী হয় আরবদের উপর। প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফাতাহ আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ইসরাইলের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আরাফাত ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। তথাকথিত অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের পূর্ণমিলনের প্রেক্ষিতে তিনি ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবীনের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান এবং সংগ্রাম চলতে থাকে। এক পর্যায়ে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকে সম্মান দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বৈধতা দেয়। জাতিসংঘে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের প্রতিনিধি বা দূতাবাসকে গ্রহণ করে। এটি পশ্চিম তীর ও গাজাকেন্দ্রিক। কিন্তু ইসরাইল, আমেরিকা এবং তাদের পশ্চিমা দোসররা মেনে নেয়নি। তারা জাতিসংঘের স্বীকৃতিকে তোয়াক্কা করেনি এবং ভূমিদখল অব্যাহত থাকে। ফিলিস্তিনের জন্য ইরান সক্রিয় হয় এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গাজায় হামাস, এছাড়া ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে ইসরাইলকে ব্যস্ত রাখে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইতোমধ্যে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়াকে ধ্বংস করে এবং ইরানকে জুজু বানিয়ে আরব মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষায় এগিয়ে আসে জ্বালানি তেলের বিনিময়ে। ঐ সব দেশে (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আবুধাবি, আরব আমিরাত) তাদেরকে সাহায্যের নামে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। ইরান শিয়া মুসলিম দেশ হওয়ায় মুসলিম এইসব সুন্নি দেশগুলো ইরান নামক জুজুর ভয়ে নিশ্চিত হয়, আর তাদের তেলের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রো-ডলার রাজত্ব কায়েম করে বিশ্বব্যাপী। এইভাবে আমেরিকা ধনে-মানে, সামরিক শক্তিতে বিশ্ব মোড়ল হয়ে ওঠে একচ্ছত্রভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে আরব দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে এবং রাজতন্ত্র বহাল তবিয়তে বজায় রাখার মাধ্যমে বিলাসী জীবনযাপন করে। এরা মুসলিম দেশগুলোর নেতা সেজে থাকে শুধু আল্লাহর ঘর কাবাশরিফ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাজার শরিফসহ মদিনা, অর্থাৎ মুসলমানদের প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ মক্কা ও মদিনার প্রতি দুর্বলতার কারণে। অথচ তারা ফিলিস্তিনের জন্য কিছু করছে না। ওদিকে ইরান পাহলভী ডাইনেস্টির রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে ইসলামী রাষ্ট্রনীতি কায়েম করে ইরানে। ইরান সৌদি ও অন্যান্য আরব রাজতন্ত্রবিরোধী এবং কখনো কখনো আন্দোলন-বিদ্রোহ করেছে।
ইসরাইল ইরানকে তাদের পথের কাঁটা বলে মনে করে এবং ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়াকে শেষ করে ইরানকে একমাত্র শত্রু মনে করে। ইরান ইতোমধ্যে শত আমেরিকান অবরোধের মধ্যে সর্বাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রসম্ভার গড়ে তোলে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ পরমাণু অস্ত্রও তৈরি করে ফেলে। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে ভর করে ইরানকে সায়েস্তা করার লক্ষ্য স্থির করে। ইতোমধ্যে ইসরাইলের সমরশক্তি ও কৌশল আমেরিকাকে মুগ্ধ করে। ইসরাইলের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ ও দুর্র্ধষ সেনা ইউনিট বিশ্বব্যাপী অঘটন ঘটনপরায়ণ হয়ে ওঠে। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনকে অপহরণ করে সারাবিশ্বে তাক লাগিয়ে দেয়। তাই আমেরিকা এদের কাজে লাগায়। তাদের সাহায্য নিয়ে বা কৌশল অবলম্বন করে যুক্তরাষ্ট্র পানামার নরিয়েগা, ভেনিজুয়েলার মাদুরো, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফির মতো রাষ্ট্রনেতাদের বন্দি বা হাইজ্যাক করে এবং প্রায় সবাইকে হত্যা করে। হামাস ও হিজবুল্লাহর উত্থানে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলতে থাকে। এদিকে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এবং হামাসের মধ্যে মতানৈক্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভিন্ন দর্শনের কারণে। এখানে শিয়া-সুন্নি ফ্যাক্টর ও কট্টরপন্থি হামাসের সঙ্গে কিছুটা নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর। বর্তমানে হামাসই ফিলিস্তিনিদের মূল শক্তি হিসেবে উদ্ভূত হয়। আর ইরান হলো তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের স্থান। ১৯৮০-৮৮ সালের আট বছরব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরান বুঝতে পারে যে, শুধু মার্কিন-ইসরাইল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও তাদের বন্ধু নয়। ফলে ইরান প্রস্তুতি নেয় একটি সমৃদ্ধ সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। ইসরাইল প্রমাদ গোনে এবং ইরানকে দুর্বল করার জন্য ফন্দি-ফিকির আঁটতে থাকে। আর যুক্তরাষ্ট্রকে তারা অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ইরানের সামরিক শক্তি, বিশেষ করে মিসাইল প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক শক্তি তাদের জন্য আশঙ্কার কারণ হয়। ২০২৫ সালের ১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ বুঝিয়ে দেয়, ইরানকে জব্দ করা সহজ নয়। যুদ্ধবিরতির পর আলোচনা চলতে থাকে, যাতে কেউই ছাড় দেয় না। আগ্রাসী পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে ইসরাইল। তিন দফা আলোচনা শেষেই কোনো ঘোষণা ও জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়া, এমনকি মার্কিন কংগ্রেস ও ন্যাটো (ঘঅঞঙ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ইরানের পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে তুমুল যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যে।
অস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশল
যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তীব্রভাবে বিমান, মিসাইল ও ড্রোন হামলা করে তেহরান ও আশপাশে। নিষ্ঠুর ও অনৈতিক আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীসহ ৪৮ জন শীর্ষস্থানীয় সামরিক-রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করে ইরান সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আশা ছিল, আয়াতুল্লাহ খামেনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের ফলে ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া ইরানের শেষ রাজা রেজা শাহ পাহলভীর পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতায় বসাবে, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নিবাসিত। তিনি মনে করেন, এখনো তিনি ইরানের শাহ বা সম্রাট! ইতোমধ্যে কয়েক মাস ধরে এই লক্ষ্যে ব্যাপক আন্দোলনে উসকানি দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে। খামেনী ও সরকার তা দৃঢ়ভাবে দমন করে। আয়াতুল্লাহ খামেনীর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় ছেলে মোহাম্মদ মোজতবা খামেনীকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে ইরানের কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স। এরপরও আরো দুই দফা আক্রমণে হত্যা করে আরো দেড় ডজন পরবর্তী শীর্ষ নেতাদের। পরক্ষণেই নতুন নেতৃত্বে সরকার ও যুদ্ধের হাল ধরে, যা ইরানের সুপরিকল্পিত। তাই প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ব্যর্থ হয়। এরপর অস্ত্রভান্ডার, সামরিক স্থাপনা, পরমাণু উন্নয়নকেন্দ্র ইত্যাদি ধ্বংস করে ইরান কর্তৃক অবরোধকৃত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে ইরানকে বাধ্য করবে যুদ্ধবিরতিতে এবং পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ করাবে। ইরানের দৃঢ় প্রতিরোধ এবং দুর্ভেদ্য অবস্থানের মাধ্যমে সুরক্ষিত পরমাণু এবং অন্যান্য মিসাইল ও ড্রোন স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। ধ্বংস করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সেনা স্থাপনা এবং শহর। প্রত্যুত্তরে ইরান ইসরাইলের অভ্যন্তরে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিমান স্থাপনা ধ্বংস করতে থাকে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ইরানের যেসব ড্রোনে প্রতি ১৫/২০ হাজার ডলার খরচ হয়, তা দিয়ে আক্রমণ করে, যা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম, মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে। ফলে আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল আগের মতো প্রতিহত করতে পারে না। ইরান তাদের নতুন প্রযুক্তি দিয়ে মার্কিন ও ইসরাইলি রাডার ও মিসাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম ধ্বংস করতে থাকে। এক পর্যায়ে দেখা যায়, ইরান সহজেই ইসরাইলের অভ্যন্তরে এবং সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, লেবানন, বাহারাইন, অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের ৯টি দেশের ২৭টি মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এসব দেশের মার্কিন ও ইসরাইলি দূতাবাসগুলোতেও ইরান হামলা করে। ফলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কিছু কিছু দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইসরাইল লেবাননে স্থল আক্রমণ করে যাচ্ছে এবং গাজায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এপর্যন্ত ইরানের দুই শতাধিক শহরের সহস্রাধিক স্থানে আঘাত করে যৌথ বাহিনী, যাতে নিহত হয় অন্যূন দুই হাজার মানুষ, ধ্বংস হয় বিভিন্ন স্থাপনা, শহর, স্কুল ও অফিস-আদালত, বাড়িঘর। এসবই যুদ্ধাপরাধের শামিল। অন্যদিকে ইরান সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করে। ইরানের তেল ও গ্যাস শোধনাগারে আঘাত করার পর পাল্টা আক্রমণে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আঘাত করে আমেরিকার পেট্রো-ডলার সংকট সৃষ্টি করার জন্য। হামলার ৭ম দিনে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের বিভিন্ন শহরে বি/২ বোমারু বিমান থেকে ব্যাপক হামলা করে। এই বিমানগুলো আকাশে ৩৭ ঘণ্টা চলতে পারে এবং আকাশেই জ্বালানি সংগ্রহ করে। ইরান পরমাণু বোমা তৈরি ও ব্যবহার করবে-মার্কিন-ইসরাইলি দস্যুরা তা মেনে নিতে পারে না। অথচ তাদের কাছেও পরমাণু বোমা রয়েছে।
ভারত থেকে যৌথ নৌ-মহড়া শেষ করে শ্রীলংকার কাছে ৪ মার্চ ২৬ একটি ইরানি জাহাজকে সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে ডুবিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে নাবিকরা মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ব্যবহৃত হয় টর্পেডো। ভারতীয় গোয়েন্দা র’-এর দেওয়া তথ্য থেকে এই আক্রমণ করা হয়। ইরানের শাহেদ-১৩৬ নিজস্ব কারিগরি উৎপাদন এবং মাত্র ১০/১৫ হাজার ডলারে তৈরি, যা এই যুদ্ধে সফলভাবে ব্যবহার করে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দেউলিয়া হচ্ছে। তাই ইরানের এই ড্রোনের নকশার অনুকরণে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি শুরু করেছে লুকাস ড্রোন (খড়-িপড়ংঃ টহপৎববিফ ঈড়সনধঃ অঃঃধপশ ঝুংঃবস)। ইতোমধ্যে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের সস্তার মিসাইল ও ড্রোন হামলায় যুদ্ধের প্রথম ৫ দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে ইরানের মাত্র ১৯ দফা হামলায়। তারা এই হামলা প্রতিহত করতে অতি দামী মিসাইল ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করে। কিন্তু তারপরও সম্পূর্ণ ঠেকাতে পারেনি। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, ইরানের এই বিশাল সংখ্যার একমুখী সব ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
যুদ্ধের অগ্রগতি
ইরানের যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহ অতিবাহিত হচ্ছে। জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়নি এখনো। যুক্তরাষ্ট্রের খায়েশ ছিল, সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ইরান কুপোকাত হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। মূলত ইরান যুদ্ধ করছে আত্মরক্ষার জন্য আক্রান্ত হয়ে। সেদিক থেকে ইরানিরা লক্ষ্যে অটল এবং আস্থাশীল। ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে ইরানের, কোনো সন্দেহ নেই। কেননা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হচ্ছে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, যে কোনো মানদণ্ডে-সম্পদ, সমরাস্ত্রভান্ডার, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে এবং সর্বোপরি মোড়লিপনায়। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরো কিছু ভূরাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এক অজেয় ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। ঠান্ডা লড়াই এবং কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিশালী দেশ। সোভিয়েতের পতনের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্যগুলো স্বাধীন হয়ে গেলে আয়তনে, জনবলে, শক্তিতে দুর্বল হয়ে যায় রাশিয়া। ন্যাটোর আদলে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ারশ চুক্তি ভেঙে যায়। চীনের সঙ্গে আগে থেকেই দূরত্ব ছিল। নিজেকে নতুনভাবে রাশিয়া সংগঠিত করে এবং পরাশক্তি হিসেবে অবশেষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সুযোগেই মূলত গত ৭০ বছর আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই অবস্থান থেকে ইরান তাদের কাছে মশক মাত্র, কেননা সে বন্ধুহীন, দুর্বল এবং একা। তাই ইরানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বৃহৎ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগে ইরান আক্রমণ করে। কিন্তু বিধি বাম। ইরান যে এমনভাবে কেঁচকা মাইর দেবে, তা তারা ভাবতে পারেনি। সিআইএ ও মোসাদের মতো বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা বাহিনীর নজর এড়িয়ে মাটির কয়েকশ মিটার নিচে আধুনিক অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে, তা এই যুদ্ধের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন নয়, ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা এবং শত শত যুদ্ধযান ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু পূর্বঘোষণা করেই ইরান প্রতিটি আক্রমণের পাল্টা আক্রমণ করেছে সফলভাবে। ইসরাইলের অবস্থা এখন গাজার ধ্বংসস্তূপের মতো। ইরানিদের নিজ উৎপাদিত সস্তার ড্রোন ও মিসাইলের বিপরীতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মিসাইল ও রাডার ব্যবহার করে অনেকটা ফতুর হয়ে গেছে মুসলিমবিদ্বেষী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এখন যেন “ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি”-র মতো অবস্থা। ইরান পরাজিত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে এবং আত্মসমর্পণে প্রস্তুত বলে তাদের আজ্ঞাবাহী মিডিয়া প্রকাশ করেছে এবং বলেছে, ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। ইরান বলে, আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধবিরতি ইরান করবে না, যারা যুদ্ধ শুরু করেছে তারাই যুদ্ধবিরতি করবে। আরো বলেছে, যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে আমেরিকাকে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ইরানকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে যুদ্ধ শেষ করতে, ধর্না দিচ্ছে রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুদের কাছে দূতিয়ালি করার জন্য। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। ইরান বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় বলে জানিয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের শীর্ষস্থানীয় ৬০/৭০ জন সরকারপ্রধান, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে তিন দফায় হত্যা করে মনে করেছিল, ইরান আর যাবে কোথায়। ইরান একই গতিতে, বরং আরো জোরালো ও দৃঢ়তার সঙ্গে নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে নাকাল করেছে তাদেরকে। খামেনিদের হত্যার বিপরীতে ইরানও নেতানিয়াহুসহ ডজনখানেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে এবং বলেছে, চোখের পরিবর্তে চোখ নেওয়া হবে। কী স্পর্ধা! ওদিকে কোনো পশ্চিমা বন্ধুদেশ ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধে শামিল হচ্ছে না। আবার ইরানও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথায় এবং কাজে ঘায়েল করছে শত্রুকে। ওদিকে নিজ জনগণও তাদের পক্ষে নেই খোদ ইসরাইলে এবং মার্কিন দেশে, প্রতিবাদ-আন্দোলন হচ্ছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তাদের সৈন্যরা হতাশা ব্যক্ত করেছে এবং তাদের মনোবল যুদ্ধমুখী নয়। দেশের তিন-চতুর্থাংশ নাগরিক যুদ্ধের প্রতি সম্মতি দেয়নি। আমেরিকানরা ইসরাইলিদের জন্য কেন যুদ্ধ করে মরবে, এই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ইসরাইলিরা দেশ ছাড়ছে। ইরানের প্রত্যাঘাতে জ্বালানি ও গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। সব মিলিয়ে এক নাকানি-চুবানি অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের। কিছুতেই ইরানকে দমন করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অন্যূন চারটির প্রতিটি লক্ষ্যই ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে ঠিক করেছে, ইরানে স্থলবাহিনী প্রেরণ করবে উভচর জাহাজ বা যানের মাধ্যমে এবং পাঠিয়েছেও। এছাড়া নিকটবর্তী দেশে বা অঞ্চলে আরো সৈন্য প্রেরণ করছে। আর ইরান বলছে, “আস, তোমাদের কবর রচনা করা হবে ইরানে”। ইরানকে বিভক্ত করার চেষ্টা করবে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। কুর্দিদেরকে অস্ত্র দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারা প্রথমে ঘোষণা দিলেও ইরানের যুদ্ধকৌশল দেখে সম্ভবত আক্রমণ এবং অঞ্চল দখল করার খায়েশ মিটে গেছে। এখনো কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ইরান প্রথম রাতেই বিল্লি মেরে দিয়েছে। ইরান আক্রমণের ঘোষণা করার পরই কুর্দিদের উপর একটা আক্রমণ করে বুঝিয়ে দিয়েছে, সাবধান হতে। ইরান যুদ্ধকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা হচ্ছে না। কোনো বন্ধু পক্ষই সাহস করছে না যোগ দিতে। ওদিকে রাশিয়া ও চীন মুচকি হাসছে। লাভবান তারাই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে গোলকধাঁধায় ঠেলে দিচ্ছে তারা। ইরানকে গোপনে গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র উৎপাদনে সাহায্য করছে রাশিয়া ও চীন। হুমকিও দিচ্ছে যৌথ বাহিনী যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করে।
শেষ কথা
যুদ্ধের ১১ দিনের মাথায় ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন, পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। আইআরজিসি (ইরানি রেভোলিউশনারি গার্ড কোর) জানিয়েছে, যৌথ হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না। তেলের মজুদ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসেছে। যুদ্ধকে বিলম্বিত বা দীর্ঘস্থায়ী করা ইরানের কৌশলগত পদক্ষেপ, যা অনেকটা বাজি ধরার মতো। তেহরানের লক্ষ্য হলো সরাসরি সংঘাত নয়, বরং টিকে থাকার এক নির্মম যুদ্ধ এবং প্রতিশোধ নেওয়া। প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ভীতি ছড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া, যাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটতে বাধ্য হয়। এদিকে হরমুজ প্রণালী অবরোধ ভাঙতে না পেরে ট্রাম্পের নজর পড়েছে ইরান উপকূলের পাশে অবস্থিত খারগ দ্বীপের দিকে, যা হরমুজ প্রণালীর উত্তর-পশ্চিমে ৭.৭ বর্গমাইলব্যাপী বিস্তৃত। এটি দখলে নিতে পারলে ইরানের তেল সরবরাহের মূল উৎস নষ্ট হবে। ১৪ মার্চ ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড খারগ দ্বীপের ৯০% সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করে ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের মোট জ্বালানির ৯০% প্রক্রিয়াজাত হয় এই দ্বীপে। ইরানের অন্যান্য দ্বীপেও হামলা হতে পারে। এদিকে জানা যায়, হরমুজের বিকল্প নৌপথ বের করেছে সৌদি আরব ও যৌথ বাহিনী। তাতে হয়তো কিছুটা তেল-গ্যাস সরবরাহ হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইরানও তা নিয়ন্ত্রণে অথবা আক্রমণ করতে তৎপর হবে। ইরান যুদ্ধের ২৩তম দিনে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফা পাঁচ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। ইরান যদি হরমুজ অবরোধ তুলে না নেয়, তাহলে তার বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত করবে যুক্তরাষ্ট্র-তাও আর হয়নি। মূলত যুদ্ধের অগ্রগতি আশানুরূপ না হওয়ায় এবং জ্বালানিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক দূরাবস্থা ও ইরানের কৌশলের কারণে ইরানি আক্রমণ রোধ করতে গিয়ে ট্রিলিয়ন ডলার গচ্ছা যাওয়ায় ট্রাম্প অনেকটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অনুরোধ করার পরও মধ্যস্থতাকারী না পেয়ে, যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে ইরানের কট্টর সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য কোনো বন্ধু রাষ্ট্র না পেয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। কিন্তু তাকে ডাহা মিথ্যাবাদী বলেছে ইরান এবং জানিয়েছে, ইরান কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করেনি। অবশেষে ২৫ মার্চ ২০২৬ জানা গেল, পাকিস্তানের উদ্যোগে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র অদ্ভুত ১৫টি শর্ত দিয়েছে এবং ইরান ৫ দফা শর্ত দিয়েছে, যাদের বাস্তবায়ন সম্ভব বলে বিশ্বাস হয় না। তাই এটা একটা কালক্ষেপণের চালও হতে পারে। হয়তো অন্য কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে, যার জন্য প্রস্তুতির সময় নেওয়া হচ্ছে। কারণ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে শক্তিমান হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না। ওদিকে আত্মবিশ্বাসী ইরান ভাঙবে, তবু মচকাবে না। তাদের কাছে আদর্শ, ঐতিহ্য ও ইমান, অর্থাৎ শক্তিমান প্রভুই শক্তির উৎস। আমরা ধ্বংসের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, এই আশাই করব।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ ও কলাম লেখক