জ্বালানি সংকটে স্পট মার্কেটে ঝুঁকছে বিপিসি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩১ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
জ্বালানি সংকটে স্পট মার্কেটে ঝুঁকছে বিপিসি

দেশে জ্বালানির মজুত দ্রুত কমে আসায় তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে নতুন করে স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তের পর এবার অকটেন নিয়েও একই পথে হাঁটছে সংস্থাটি। জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে এক লাখ টন অকটেন কেনার প্রস্তাব ইতোমধ্যে বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়েছে এবং তা এখন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

সংস্থার ভেতরের হিসাব বলছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। চলতি মাসে দৈনিক ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, সে তুলনায় মজুত অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। মার্চের প্রথম ২৩ দিনে যে পরিমাণ বিক্রি হয়েছে, তার ভিত্তিতে দৈনিক গড় ব্যবহার হাজার টনের বেশি। অথচ হাতে থাকা ব্যবহারযোগ্য মজুত দিয়ে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় চলা সম্ভব-এমন পরিস্থিতিই দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে।

এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে। সরকারি-বেসরকারি উৎস মিলিয়ে যে পরিমাণ অকটেন পাওয়া যায়, তা দিয়ে পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় সরবরাহ চালু থাকলেও প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ফলে নতুন আমদানি না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই মজুত শূন্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়েছে বিপিসি। দুবাইভিত্তিক ডিবিএস ট্রেডিং হাউজ ফেজকো প্ল্যাটস আরব গালফের নির্ধারিত দামের তুলনায় ৫ শতাংশ কম মূল্যে অকটেন সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক এই অফারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে।

২৩ মার্চের বৈশ্বিক মূল্যসূচক অনুযায়ী, প্ল্যাটস আরব গালফে গ্যাসোলিন-৯৫ বা অকটেনের দাম প্রতি ব্যারেল ১৬৩ দশমিক ৭১ ডলার নির্ধারিত ছিল। এই দরে হিসাব করলে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের সমপরিমাণ এক লাখ টন অকটেন আমদানিতে প্রয়োজন হবে ১৩ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটিরও বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এ মুহূর্তে জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক সরবরাহকারী পূর্ব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। ফলে নির্ধারিত চালান বাতিল হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, একই প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিপিসিকে বড় পরিসরে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় অকটেন সরবরাহের প্রস্তাবও এসেছে। তুলনামূলক কম দামে সরবরাহের কারণে বোর্ড এ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ক্রয় কমিটির অনুমোদন পেলে এলসি খোলাসহ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এর আগে স্পট মার্কেট থেকেই বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিপিসি। পরপর কয়েকটি বোর্ড সভায় মিলিয়ে কয়েক লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে সংস্থাটি এখন ক্রমেই স্পট মার্কেট নির্ভর হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে-দাম বেড়েছে, সরবরাহ কমেছে, আর চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্যও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বাড়তি দামে হলেও দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের পথে হাঁটতে হচ্ছে।

তাদের মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস, মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব ভবিষ্যতেও দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।