হামের ভয়াবহ বিস্তার

টিকা কর্মসূচিতে অব্যবস্থাপনার মাশুল

এফএনএস
| আপডেট: ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম | প্রকাশ: ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম
টিকা কর্মসূচিতে অব্যবস্থাপনার মাশুল

বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। নিয়মিত টিকার মাধ্যমে দেশে বহু সংক্রামক রোগ নির্মূল হয়েছে, হামও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, প্রতিদিনই নতুন সংক্রমণের খবর আসছে। তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৭০০ শিশু, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ গুণ বেশি। গত বছর একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন। দেশের আট বিভাগেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি মহামারির দিকে যাচ্ছে। এই ভয়াবহতার মূল কারণ টিকা প্রদানে অব্যবস্থাপনা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে টিকার মজুদ থাকলেও লোকবলের অভাবে তা প্রয়োগ হয়নি। আবার অনেক সময় টিকার ঘাটতিও ছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাতিল, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ে ঢিলেঢালা আচরণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত পদে বারবার পরিবর্তন- সব মিলিয়ে টিকা কর্মসূচি ভেঙে পড়ে। এর মাশুল দিতে হলো শিশুদের জীবন দিয়ে। একটি দেশে সরকার আসবে-যাবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরকার পরিবর্তন জনস্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনার অজুহাত হতে পারে না। দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শতাধিক শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই প্রশ্নহীন থেকে যেতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই তিনটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, দ্রুত হামের টিকা এনে তা প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইপিআইয়ের অভিজ্ঞতা এবং তালিকাভুক্ত হাজারো স্বেচ্ছাসেবককে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাব্যবস্থার দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, মাঠ পর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারকে আরও তৎপর হতে হবে। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো টিকা কর্মসূচি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাহত না হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনস্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে রাখতে হবে। শিশুদের জীবন নিয়ে অবহেলা কোনোভাবেই চলতে পারে না। টিকা কর্মসূচি শুধু স্বাস্থ্য নয়, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। আগামী রোববার থেকে দেশের সব উপজেলায় হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে আর কোনো শিশুর জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে। সরকারের দায়িত্বশীলতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিকতা এবং জনগণের সহযোগিতা মিলেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। আমরা মনে করি, হামের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের টিকা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। শিশুদের জীবন রক্ষায় কোনো অবহেলা বা অজুহাত চলতে পারে না। জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে- এটাই সময়ের দাবি।