শ্রীমঙ্গলের সংবাদপত্র জগতের নীরব প্রহরী অরবিন্দ কুমার পাল

এফএনএস (আতাউর রহমান কাজল; শ্রীমঙ্গল, মৌলভী বাজার) : | প্রকাশ: ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০২:২৫ পিএম
শ্রীমঙ্গলের সংবাদপত্র জগতের নীরব প্রহরী অরবিন্দ কুমার পাল

সংবাদপত্র কেবল খবরের বাহক নয়, এটি সময়ের দলিল, সমাজের আয়না এবং ইতিহাসের ধারক। আর সেই ইতিহাসকে নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যে যারা নীরবে কাজ করে যান, তাঁদের একজন শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ সংবাদপত্র পরিবেশক অরবিন্দ কুমার পাল। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শ্রীমঙ্গলে সংবাদপত্র বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটি আজ নিজেই যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি শুধু পত্রিকা বিক্রেতা নন, বরং পাঠকসমাজ ও সংবাদজগতের মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। অরবিন্দ পালের সংবাদপত্র জগতে পথচলা শুরু হয় পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। তাঁর পিতা স্বর্গীয় অমূল্য চন্দ্র পালের হাত ধরেই শৈশবে তিনি এই পেশায় যুক্ত হন। অবিভক্ত পাকিস্তান আমল থেকেই পত্রিকা পরিবেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার আগে ও পরবর্তী সময়ে শ্রীমঙ্গলে হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা-দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ ও অবজারভার-এসেই সীমাবদ্ধ ছিল সংবাদজগত। এসব পত্রিকা সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে তাঁর পরিবারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন ছিল পত্রিকা বিক্রয়ের প্রধান কেন্দ্র। তুফান মেল ট্রেনযোগে আখাউড়া হয়ে পত্রিকা এসে পৌঁছাত এখানে। মাত্র তিন পয়সা দামে পত্রিকা বিক্রির সেই সময় থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ-সবকিছুরই প্রত্যক্ষ সাক্ষী অরবিন্দ পাল। শুধু দেশীয় নয়, ভারতীয় ‘আনন্দবাজার’ কিংবা পাকিস্তানের ‘ডন’-সহ বিভিন্ন বিদেশি সাময়িকীও একসময় তাঁর মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছাত।

আশির দশকের শুরুতে সড়কপথে পত্রিকা পরিবহন শুরু হলে এই ব্যবস্থায়ও তিনি নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশক থেকে তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় সার্বক্ষণিক সহযাত্রী হিসেবে যুক্ত হন তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা, দৈনিক সংবাদের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি অসীম পাল শ্যামল। সংবাদপত্রের ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী অরবিন্দ পাল স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা কিংবা ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়-কোনো কিছুই কখনো শ্রীমঙ্গলে পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ করতে পারেনি। এমনকি পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের উত্তাল সময়েও সংবাদপত্রের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়নি।

তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রথমবারের মতো টানা কয়েকদিন পত্রিকা না আসার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই প্রথম মনে হলো, সংবাদপত্রের ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতে পারে। চারদিকে এক অজানা শূন্যতা নেমে এসেছিল।” ব্যক্তিজীবনে অরবিন্দ পাল অত্যন্ত সাদাসিধে, নিরহংকার ও প্রচারবিমুখ। দীর্ঘদিনের এই নিবেদিতপ্রাণ সেবার মাধ্যমে তিনি শুধু একজন পত্রিকা পরিবেশক নন, বরং শ্রীমঙ্গলের সংবাদপত্র ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। নিভৃতচারী এই মানুষটির সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছেন শ্রীমঙ্গলের সচেতন মহল। তাঁর মতো মানুষের হাত ধরেই সংবাদপত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা আজও অটুট রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে