সংগীতের প্রথম বাহন হিসেবে অভিহিত করা হয় বাঁশিকে। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র এসেছে বাঁশির বহু বছর পর। ধারণা করা হচ্ছে প্রাচীন ভারতে অন্তত ৬ হাজার বছর আগে এ বাদ্যযন্ত্রটি সংগীতে ব্যবহার করা হয়। বাঁশিতে ৬টি ছিঁদ্র থাকে। এ ছিঁদ্রগুলোর মধ্যেই বংশীবাদকগণ গানের স্বরলিপি খুঁজে পান, অব্যক্ত বাসনা খুঁজে পান, প্রাণ খুঁজে পান।
বাঁশির সুর যেভাবে মন ছুঁয়ে যায় আলতোভাবে, অন্য কোন যন্ত্রে তেমনটি নয়। মূলত: বাঁশ তথা নলের বাঁশিকেই আমরা 'বাঁশি' হিসেবে প্রথমত: গন্য করে থাকি। এ উপকরণের বাদক বাংলাদেশে উল্লেখ সংখ্যক নয়। এটির অর্জন অনেক কষ্টসাধ্য এবং ব্যাপক সাধনার প্রয়োজন। এ সাধনা বা অধ্যবসায়ের জন্য অনেক ধৈর্য্যরে প্রয়োজন হয়। শিল্পগুন বিচারে এ বাহনের গুরুত্ব অনেক বেশি। কিন্তু বাঁশি সাধকের সংখ্যা কমে গেছে অনেক। তাদেরকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছেনা, উৎসাহিত করা হচ্ছেনা। নেই কোন পৃষ্ঠপোষকতা। তাই সংগীতে এ আদি যন্ত্রের ব্যবহারও বেশি দেখা যাচ্ছে না। উইকিপিডিয়া বলছে, 'বাঁশি ছয় প্রকারের।সেগুলো হচ্ছে,সরল বাঁশি,আড় বাঁশি,টিপরাই বাঁশি,সানাই বাঁশি,ভিন বাঁশি, মোহন বাঁশি। উইকিপিডিয়ার মতে, "বাঁশিতে সংগীতের সাতটি স্বর (সা রে গা মা পা ধা নি) এবং পাঁচটি বিকৃত স্বর ( ঋ জ্ঞ ক্ষ দ ণ), সর্বমোট ১২ টি স্বরই পাওয়া যায় ।বাঁশিতে সুর পরিবর্তন (টিউনিং) করা যায় না, তাই একজন বংশীবাদক কে ১২ টি স্কেলের ১২টি বাঁশিই সাথে রাখতে হয়।
এ মাধ্যমটি সংগীতের অত্যন্ত নিখাদ উপকরণ হিসেবে গুরুত্ব অত্যদিক। এর গুরুত্ব অতি চূঁড়ায় রয়েছে, বলতে গেলে ইতিহাসেরও মগডালে অবস্থান করছে। পৃথিবীর মহাপ্রলয়ে বাঁশির বিনাশি শক্তির মাহাত্ন্য এবং রাধাকৃষ্ণের যুগলবন্দীতেও বাঁশির ব্যবহার রয়েছো। বাঁশি নিয়ে আলোচনা আছে ঋগ্বেদ গ্রন্থে। সময়কাল খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০-১২০০। তবে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় বাঁশির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে অন্তত ৬০ হাজার বছর আগে। স্লোভানিয়া অঞ্চলে তখন এর প্রচলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ সময় ভালুকের হাড় দিয়ে বাদ্যযন্ত্রের বাহন হিসেবে বাঁশি তৈরী হতো। নিয়ানডাথালীয় মানবগোষ্ঠী এ বাহনটি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। এরাই বাদক হিসেবে প্রথম। আর শাস্ত্রীয় সংগীতে ভারতের চৌরাসিয়া ও বাংলাদেশের পান্নালাল ঘোষ এ মহান দু'ব্যক্তি উপমহাদেশে প্রথম বাঁশিবাদক। আর জার্মানিতে ৩৫ হাজার বছর আগে বাঁশির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর চীন এবং পেরুতে প্রায় ৯ হাজার বছর আগে বাঁশির প্রচলন হয়ে থাকে। উপনিষদ ও যোগেও এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বৈদিক গ্রন্থে একে নাদী আর তূণব হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন ভারতে ধর্ম সাধনায় উচ্চাঙ্গ সংগীতে 'বাঁশি'র ব্যবহার হতো। তবে আমরা পড়েছি, বংশীবাদক সেই হ্যামলিনের বাঁশির জাদুর মাহাত্ম্য। সিনেমা-গল্পে পাঠসাধনায় দেখেছি বাঁশিবাদকের সুরের মূর্ছনায় কিভাবে কপোতিকে উদাস করে দিয়ে আবিলতায় মজে যায়। নিষ্প্রাণ হৃদয়কে কিভাবে উজ্জীবন করেছে। থিতিয়ে পড়া মনকে করেছে চাঙ্গা। বলতে গেলে :বাঁশি' সুরের জগতের এক দখলকার যন্ত্র। উত্তরাধুনিকতায় বাঁশির আবেদন-নিবেদন মোটেও কমতি নেই। তবে যান্ত্রিক জীবনে এর সাধনা ক্রমাবনতি ঠেকেছে। তাই এটিকে টিকিয়ে রাখার আবশ্যকতা অনুভব করে জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পদক্ষেপ নিয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। তাই ২০২১ সালে চাঁদপুরের বড়স্টেশন মোলহেডের জনাকীর্ণ স্থানে 'প্রথম বাঁশি উৎসব' উদযাপিত হয়। আমাদের জানামতে বাংলাদেশে বাঁশিভিত্তিক কোন উৎসবের আয়োজন জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাধ্যমেই প্রথম। প্রথম উৎসবেই দর্শকের উপস্থিতি এবং আগ্রহ ছিল বেশ লক্ষ্যনীয়। উৎসবে কেবলমাত্র তিনজন বংশীবাদক অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে 'দ্বিতীয় বাঁশি উৎসব' উদযাপিত হয়। এ উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ১০ জন বংশীবাদক বাঁশি বাজিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মন কেড়েছেন। উৎসবে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রয়াত বংশীবাদকদেরকে মরনোত্তর সম্মাননার ক্রেস্ট পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এ উৎসবে বাঁশিভিত্তিক চিত্রাঙ্কন ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পাশিপাশি বাঁশিভিত্তিক গান, নৃত্য পরিবেশন হয়েছে।
'তৃতীয় বাঁশি উৎসব -২০২৬' অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৭ এপ্রিল,শুক্রবার চাঁদপুর প্রেসক্লাবে।
উৎসবের আয়োজন উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত গণসংগীতশিল্পী ও জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপদেষ্টা মনোজ আচার্যীকে।
এ তিনটি উৎসবের পরিকল্পনা, গ্রন্থনা মূলত: অত্র সংগঠনের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন অর্থাৎ আমাকে করতে হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়ভার থেকে এ কাজটি অগ্রসর করে নিতে হচ্ছে। এটিকে এগিয়ে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে এবং হিমশিম খেতে হচ্ছে। এটা আমার কাছে কঠিন ব্রত হয়ে গেছে। সংগঠনের হাতেগোনা কয়েকজন সদস্য এ কাজটি সম্পন্ন করতে আন্তরিক থাকেন। উৎসব সফল করতে অলঙ্কারবর্ধনের জন্য প্রতিবারই উৎসব কমিটি গঠন হয়ে থাকে-কাজটিকে আরও প্রাঞ্জল ও গতিশীল করতে। কাজকে শানিত করতে হলে উৎসব কমিটিকে আরও সক্রিয় করে তুলতে ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। চাঁদপুরের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী এ উৎসবের পাশে থেকে উৎসাহ যোগাচ্ছেন। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাঁশি উৎসবের উদ্বোধন করেন চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, রাজনীতিক অ্যাড: সেলিম আকবর। প্রধানঅতিথি ছিলেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা শাহনাজ। ইউএনও সানজিদা শাহনাজকে বাঁশি উৎসবের থিম তুলে ধরায় তিনি বেশ আগ্রহী হন। আমাদেরকে উৎসাহ দেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েও পাশে ছিলেন। উৎসবটি ত্রিনদী মোহনার বড়স্টেন মোলহেডে উন্মুক্ত পরিবেশে আয়োজন করা হয়েছিল।
২০২৩ খ্রিস্টাব্দে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দ্বিতীয় বাঁশি উৎসবের উদ্বোধন করেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-এর কমান্ডার এবং তৎকালীন বিজয়মেলা কমিটির চেয়ারম্যান যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা এম.এ ওয়াদুদ।
এ বছর(২০২৩ খ্রিস্টাব্দ) তৃতীয় বাঁশি উৎসবের উদ্বোধন করবেন, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার জহির উদ্দিন বাবর। উদ্বোধনী পর্বে প্রধান আলোচক হিসেবে থাকবেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক চাঁদপুর খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক সোহেল রুশদী। বিশেষ অতিথি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও চাঁদপুর সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রের আহবায়ক শরীফ চৌধুরী, প্রকৌশলী সামাউন কবির, বিজয়ী নারী উন্নয়ন সংস্থার ফাউন্ডার তানিয়া ইশতিয়াক খান। এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখবেন উৎসবের আহবায়ক ও জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপদেষ্টা অ্যাড. নুরুল হক কমল।
সমাপনী পর্ব ও পুরষ্কার বিতরণী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকছেন, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবক ডা. মোবারক হোসেন চৌধুরী। প্রধান আলোচক হিসেবে থাকছেন মৎস্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এর অধ্যক্ষ বি.এম. মোস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম.এ লতিফ, চাঁদপুর রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ চাঁদপুর শাখার সভাপতি সাংবাদিক ফারুক আহম্মদ এবং রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ফয়সাল আহমেদ বাহার। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপদেষ্টা রোটা: গোপাল সাহা।
অনুষ্ঠানে সভাপ্রধান থাকছেন জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি ও বাঁশি উৎসবের উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর হোসেন ও সঞ্চালনায় থাকছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড.মো. মাসুদ রানা।
উৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে সংগঠনের উপদেষ্টা অ্যাড. নুরুল হক কমলকে ও সদস্য সচিক করা হয়েছে সহ-সভাপতি প্রশান্ত সরকারকে।
এবারের উৎসবে বাঁশিবাদক থাকছেন ০৮ জন। এ অনুষ্ঠানে বাঁশিভিত্তিক চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা থাকছে। বাঁশির উৎপত্তি, তাৎপর্য়, শিল্পগুন এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এসব প্রতিযোগিতা রাখা হয়েছে। উৎসবটি চাঁদপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আশা করছি আগামীতে এ উৎসবটি জাতীয় রুপ দেয়ার পরিকল্পনা আমার রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার বংশীবাদকদের মিলনমেলা ঘটাবো। এ বিষয়টি জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্বাহী ফোরামে তুলে ধরা হবে। জেলার সংস্কৃতিমনা সকলের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে এ কাজটি অগ্রসর করবো। শুধু তাই নয়, এ জনপদের সংস্কৃতিকাজের বিশেষ পরিচায়ক 'পুঁথিপাঠ' উৎসবও আয়োজন করার পরিকল্পনা আছে এ বছরই। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘোষণা করেছি।