সরকার নির্ধারিত বেতন-ভাতায় সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেও বরিশাল জেলা জামায়াতে ইসলামীর বায়তুল মাল সম্পাদক অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নগরীর সিএন্ডবি রোড এলাকায় তার নামে ও বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বরিশাল নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিএন্ডবি রোড এলাকায় ‘বন্ধন’ নামের একটি ভবনে বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর সন্ধ্যা নদীর তীরে অবস্থিত সরকারি শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। একই এলাকায় নির্মাণাধীন তিন ইউনিটের ১০ তলা ভবনে আরও চারটি ফ্ল্যাট তার নামে বা বেনামে রয়েছে। সব মিলিয়ে ছয়টি ফ্ল্যাটের জমিসহ আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা।
সরেজমিনে সিএন্ডবি রোডের লাইফ কেয়ার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে নির্মাণাধীন ওই ভবনের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনটিতে প্রায় ২০ জন শেয়ার থাকার কথা থাকলেও নির্মাণকাজ ও ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে রয়েছেন অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ভবনের জমিটি ‘ক’ তফসিলভুক্ত হওয়ায় এর মালিকানা ও কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি মালিকানাধীন জমি একজন ব্যক্তির নামে দেখিয়ে কাগজপত্র তৈরি এবং পরবর্তীতে ভবনের প্ল্যান অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র পরীক্ষার দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনের সামনে মাত্র প্রায় ছয় ফুট প্রশস্ত একটি গলি রয়েছে। সিটি করপোরেশনের বিধিমালা অনুযায়ী এমন সরু রাস্তার পাশে ১০ তলা ভবনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তাও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্ল্যান শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আহসান হাবিব কামাল মেয়র থাকাকালীন সময়ে রেজুলেশন অনুযায়ী ৬/৭ ফুট সড়কের পাশে সর্বচ্চো তিন তলা ভবন নির্মাণে প্ল্যান পাশের অনুমতি ছিলো। এরপর আর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জামায়াত নেতা অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের নির্মানাধীন ১০ তলা ভবনের বিষয় জানতে চাইলে তারা বলেন, এই ভবন সম্পর্কে বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ অবগত নন। তারা আরও বলেন, বিসিসির চোখে ফাঁকি দিয়ে এভাবে কেউ বেআইনি ও অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করলে কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
অপরদিকে অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম একই সঙ্গে সরকারি কলেজের শিক্ষক এবং একটি রাজনৈতিক দলের বায়তুল মাল সম্পাদক হওয়ায় তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহলের কেউ কেউ বলছেন, সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা আইন ও সরকারি চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ১৯৭৯-এর বিধি ২৫ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দল বা এর অঙ্গ সংগঠনের সদস্য কিংবা অন্য কোনো উপায়ে সম্পৃক্ত থাকতে পারবে না। দেশের ভেতরে কিংবা বাহিরে কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ড বা প্রচারভিযানে অংশগ্রহণ কিংবা সহায়তা করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা থাকলে সরকারি আইন অনুযায়ী তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার এখতিয়ার রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও বরিশাল জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাহমুদুন্নবীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের নির্বাচনী কার্যক্রমে অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম প্রধান আসন পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও ভূমি কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিসিসি থেকে ৩ ইউনিটের ৯ তলা ভবনের প্ল্যান পাশ করিয়েছি। বরিশাল জেলা জামায়াতের বাইতুল সম্পাদক পদে থাকার বিষয়ে বলেন, আমি জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত কিন্তু কোনো পদে নাই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহামুদুন্নবীর দাঁড়িপাল্লা মার্কার আসন পরিচালকের দ্বায়িত্ব পালন সম্পর্কে বলেন, নির্বাচনী সকল কর্মকান্ডে ছিলাম। তবে সরকারি চাকরি করার কারণে দলীয় কোনো পদে নেই। তিনি আরও বলেন, নির্মানাধীন ভবনে আমার ভাগ্নের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।