খাদ্য ব্যবসায় বাধ্যতামূলক হচ্ছে নিবন্ধন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
খাদ্য ব্যবসায় বাধ্যতামূলক হচ্ছে নিবন্ধন

খাদ্য ব্যবসায় বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে নিবন্ধন। সরকার রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সকল প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে চাচ্ছে। মূলত দেশের সব খাদ্য ব্যবসাকে শৃঙ্খালায় আনতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য ব্যবসায়ীদের ডাটাবেজও তৈরি করা হচ্ছে। ফলে ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন নিতে হবে আর নির্দিষ্ট ও বিশেষ ধরনের খাদ্য ব্যবসায় নিতে হবে লাইসেন্স। ইতিমধ্যে সরকার নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর আওতায় নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। ওই বিধিমালায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসায়ীদের শুধু নিবন্ধন নিতে হবে। যেমন- রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধন করতে হবে। খাদ্য ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে আছে হোটেল রেস্তোরাঁ ও চা-স্টল। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার রেস্তোরাঁ আছে। আর দেশজুড়ে প্রায় ৬৭ হাজার ফাস্টফুডের দোকান আছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। বর্তমানে দেশের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও নিরাপত্তার ছাড়পত্র নিতে হয়। আর তাতে পড়তে হয় নানা জটিলতায়। ১২টি সরকারি সংস্থা বর্তমানে আলাদাভাবে খাদ্য ব্যবসায় তদারকি ও অভিযান চালায়। যদি দেশের পুরো খাদ্য ব্যবসা খাতটি একটি কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার অধীনে পরিচালিত হলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি অনেক কমে আসতো। কিন্তু না তা করে নতুন করে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করায় হয়রানি আরো বাড়তে। কারণ তখন লাইসেন্সের নামে ব্যবসায়ী নানাভাবে হয়রানি হবে। 

সূত্র জানায়, দেশের খাদ্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। শুধু একটি বিধিমালা দিয়ে বিপুলসংখ্যক ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় এনে সুষ্ঠুভাবে চালানো যাবে না। কারণ লাখ লাখ ব্যবসায়ীকে লাইসেন্সের আওতায় আনার মতো সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আছে কিনা তা বিবেচনা করা জরুরি। তা নাহলে সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বিদ্যমান অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়াবে। তখন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেয়ে আরো জটিল হবে ব্যবসায়িক পরিবেশ। যদিও বিএফএসএর দাবি, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। সেজন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে হবে। ফলে অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকবে না। 

সূত্র আরো জানায়, দেশে অতি গুরুত্বপূর্ণ বা বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ব্যবসা, যেমন- শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, ফর্টিফায়েড খাবার, অর্গানিক পণ্য, জিনগত পরিবর্তন করা খাবার এবং বিকিরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স নিতে হবে। তাছাড়া লাইসেন্সের আওতায় আসবে বেসরকারি খাদ্যের গুদাম ও হিমাগারও। পাশাপাশি ভোজ্যতেলের পাইকারি বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, আমদানি এবং বাজারজাতকরণে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও এই বিধিমালার আওতাভুক্ত হবেন। বিধিমালা অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে ৩ বছর এবং তারপর তা নবায়ন করতে হবে। নিবন্ধনের ফি এক হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং নবায়নের খরচ হবে ৫০০ টাকা। খাবারের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি ফ্লোরের আকারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। আর ছোট দোকানের জন্য ওই ফি এক হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ হাজার টাকা। খাদ্য মজুত করার ক্ষেত্রে ২০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় গুদামের লাইসেন্স নিতে দিতে হবে ৪০ হাজার টাকা। তাছাড়া স্বয়ংক্রিয় কিংবা হাতে তৈরি সব ধরনের বেকারিও এই নীতিমালার আওতায় আসবে এবং তাদের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। 

এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ রুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া যদি সুশৃঙ্খল হয় এবং এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটে, তবে ব্যবসায়ীরা একে স্বাগত জানাবে। কিন্তু লাইসেন্স করতে গিয়ে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হলে তা হবে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বোঝা। বর্তমানে দেশে বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি ছোট-বড় বেকারি রয়েছে, যেগুলোতে রুটি-পাউরুটি হাতে বানানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে লাইসেন্সিং ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানির কারণ ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপদ বাড়বে। তখন সরকারের ভালো উদ্দেশ্যের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই পড়বে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের মতে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি-রপ্তানি নীতি রয়েছে। খাবারের মান নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশে বিএসটিআই রয়েছে। বিএফএসএ খাদ্যপণ্য আমদানির অনুমতি দেয়ার ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চাচ্ছে। যা ব্যবসায়ীদের নতুন করে জটিলতা বাড়াবে। যদিও কর্তৃপক্ষের দাবি, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে হবে বলে কোনো হয়রানি হবে না। কিন্তু পাসপোর্ট বা বিআরটিএর মতো সেবাগুলো অনলাইন হওয়ার পরেও মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। 

এ প্রসঙ্গে বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, হয়রানি কমাতে পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করার মেকানিজম করা হচ্ছে। তাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। নিবন্ধনের জন্য ফি অনেক কম হবে। খাবার ব্যবসায়ীদের তালিকা বা ডেটাবেজ না থাকলে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব নয়। খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তার ধারের খাবারকেও নজরদারিতে আনা জরুরি, যাতে কেউ খাবারের সাথে ক্ষতিকর কিছু মিশিয়ে দিতে না পারে। সারাদেশে প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার খাদ্য ব্যবসায়ীর ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। যা আগামী ৬ মাসের মধ্যে শেষ হতে পারে। ওই তালিকায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ভাসমান বা সিজনাল স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন হলেও তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হবে।