দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বাচাশ্রই) নির্বাচন এবং ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানে দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন চা শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সিলেট ভ্যালির প্রতিটি চা বাগানে সকাল থেকে নির্ধারিত সময়ে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে এ কর্মসূচি পালন করেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা।
চা শ্রমিকদের দাবি, প্রায় এক মাস ধরে তারা দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, ২০২৩ সালে প্রণীত চা শ্রমিক স্বার্থবিরোধী গেজেট বাতিল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় দিনের মতো বৃহস্পতিবারও দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হয়। চা শ্রমিক পারভিন আক্তার বলেন, আমরা সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছি না, সঠিকভাবে রেশনও পাচ্ছি না। সপ্তাহে মাত্র একদিন ৩ কেজি ৪০ গ্রাম আটা অথবা চাল দেওয়া হয়। এটাই আমাদের জীবন চলার অবস্থা। এভাবে কি মানুষ বাঁচতে পারে? তিনি বলেন, আমরা এই দেশের নাগরিক। আমাদেরও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। আমাদের দাবি ও সমস্যাগুলো আপনারা তুলে ধরুন।
দলদলী চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি শ্রী মিন্টু দাস বলেন, ওই লড়াই বাঁচার লড়াই। চা শ্রমিকদের ২০০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তাঁদের শিকলে বেঁধে রাখার মতো শোষণ চলছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে শ্রমিকরা না খেয়ে মারা যাবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারদর থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ চা শ্রমিকদের মজুরি সেই তুলনায় বাড়ছে না। তাই শ্রমিকদের জীবনযাপন দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
মহিলা পঞ্চায়েত সভাপতি অনিতা দাস বলেন, “আমাদের চা শ্রমিকদের সব সময় ব্যবহার করা হয়েছে। ভোটের সময় এলে এমপি, মন্ত্রীরা এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন এবং ভোটে জয়ী হলে শ্রমিকদের সব দাবি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এখন আমরা ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছি-তখন কি তাঁরা আমাদের দেখতে পান না?” অনিতা দাস বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যাব না। আমরা ঘুরে ফিরে আমাদের দাবি আদায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ও মহিলা সদস্য সুমা নায়েক বলেন, আমরা শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছি, কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকার পাইনি।
ন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এ সামান্য মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করাও কঠিন। তাদের মতে, ৫০০ টাকা মজুরির দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং শ্রমিক ও তার পরিবারের ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি। চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অজিত রায় বাড়াইক বলেন, মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি পাশ কাটিয়ে শুধু বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়বে। তাদের দাবি, সংশোধিত শ্রম আইনের ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল করে নতুন করে চা শ্রমিকদের মজুরি পুনর্র্নিধারণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, আন্দোলনরত চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসে চার দফা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ, ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন এবং চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উল্লেখ্য ২০২৩ সালের গেজেটে ‘এ’ ক্যাটাগরির চা বাগানের শ্রমিকদের দৈনিক নিম্নতম মজুরি ১৭০ টাকা, ‘বি’ ক্যাটাগরির বাগানে ১৬৯ টাকা এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির বাগানে ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিকদের বছরে ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির বিধান রাখা হয়, যা নিয়ে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি রয়েছে। এছাড়া গেজেটে বিনামূল্যে বাসস্থান ও চিকিৎসাসুবিধাসহ শ্রমিকদের বিদ্যমান কিছু সুযোগ-সুবিধার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।