রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়নের ওমরগাড়ী এলাকায় সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি পাতকুয়া (ডাগওয়েল) দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। সোলার কনভার্টার চুরি হয়ে যাওয়ায় পানি উত্তোলন বন্ধ থাকায় সেচসংকটে পড়েছেন শতাধিক কৃষক। বিকল্প উপায়ে সেচ দিতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। আসন্ন রবি মৌসুমের আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। কৃষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও পাতকুয়াটি চালুর উদ্যোগ পাননি তাঁরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাতকুয়া থেকে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে খরচ হতো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অথচ স্যালো মেশিনের সাহায্যে একই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে ব্যয় হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। আমন ধানে বাড়তি খরচে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি রবি মৌসুমের গম, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজি চাষ নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন তাঁরা।
চুরির আশঙ্কায় পাতকুয়ার অপারেটর সোলার প্যানেলগুলোও খুলে নিজের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন অপারেটর। ফলে কনভার্টার কেনা ও পাতকুয়া পুনরায় চালুর উদ্যোগ না হওয়া পর্যন্ত সেচসুবিধা ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন না কৃষকেরা।
চুরি হওয়া কনভার্টারটির দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট খরাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের সেচসুবিধা দিতে ২০১৯ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প’ হাতে নেয়। ওই বছরের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পের আওতায় চারঘাটে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাঁচটি পাতকুয়া নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি পাতকুয়ার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪১ জন কৃষককে নিয়ে একটি করে সমিতি গঠন করা হয়।
বিএমডিএ আরও জানায়, এর আগে একই পাতকুয়ার সোলার প্যানেল চুরি হয়েছিল। তখন কৃষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন প্যানেল দিয়ে পাতকুয়াটি চালু করা হয়। তবে ভবিষ্যতে আবার চুরি হলে নতুন করে সরঞ্জাম দেওয়া সম্ভব হবে না বলে কৃষকদের শর্ত হয়েছিল। যেন কৃষকেরা নিজ দায়িত্বে পাতকুয়াটি পাহারার ব্যবস্থা করে। এবার কনভার্টার চুরি হওয়ায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। বিএমডিএর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে কনভার্টার মজুত না থাকায় কৃষকদের নিজ উদ্যোগে সেটি কিনতে বলা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক লালন আলী বলেন, রবি মৌসুম শুরু হচ্ছে। অনেক কৃষক আগাম গম, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ শুরু করেছেন। সেচের অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুই মাস ধরে কৃষকেরা সমস্যায় থাকলেও সমাধানে কেউ এগিয়ে আসছেন না।
কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, তাঁদের জমিতে ফুলকপি, বেগুন, মুলা, শিমসহ বিভিন্ন সবজি রয়েছে। এসব ফসলে নিয়মিত পানি দিতে হয়। রবি মৌসুম পুরোদমে শুরু হওয়ার আগে পাতকুয়াটি চালু করা না গেলে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সঙ্গে কথা বলে পাতকুয়ার আশপাশে নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে। পাতকুয়ার অপারেটর আশরাফুল ইসলাম বলেন, এলাকার কৃষকেরা অসহায়। অধিকাংশেরই দুই-এক বিঘা করে জমি। তাঁরা সবজি ও ফল চাষের ওপর নির্ভরশীল। তাই পাতকুয়াটি চালু করা খুব জরুরি। কনভার্টার চুরির পর থানায় লিখিত অভিযোগও করেছি, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) উদ্যোগ নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বসে কনভার্টার কেনার ব্যবস্থা করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
বিএমডিএর চারঘাট উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাতকুয়াটি থেকে আশপাশের অনেক কৃষক সেচসুবিধা পান। এটি বন্ধ থাকায় তাঁরা সমস্যায় পড়েছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে কার্যালয়ে কনভার্টার সরবরাহ না থাকায় আপাতত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকেরা কনভার্টার কিনে দিলে পাতকুয়াটি চালু করতে সহযোগিতা করা হবে। এ জন্য কয়েকটি কনভার্টার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। তবে কৃষকদের দাবি, পাতকুয়াটি জনশূন্য এলাকায় হওয়ায় শুধু তাঁদের পক্ষে চুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁদের মতে, কৃষকদের অর্থায়নে কনভার্টার কেনা হলেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে আবারও চুরির আশঙ্কা থেকে যাবে।
নিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে কৃষকদের নিয়ে সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্রুত পাতকুয়াটি চালু করা না গেলে রবি মৌসুমে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।