আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ পোড়ানোর যে অভিযোগ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে, সেই মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার হাড়হিম করা বিবরণ তুলে ধরেছেন পুলিশের সাবেক এসআই শেখ আফজালুল হক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ এ রোববার ১৯ নভেম্বর তার সাক্ষ্যে উঠে এসেছে গুলির মুহূর্ত থেকে শুরু করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার পুরো চিত্র। শহীদদের জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ জানিয়ে তিনি আদালতের কাছে ক্ষমাও চান।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সেদিন আশুলিয়া থানার সামনে ছাত্র জনতার মিছিল এগিয়ে এলে পুলিশ সদস্যরা সরাসরি গুলি ছোড়ে। একের পর এক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকেন। পরে মরদেহগুলো ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সেদিনই পেট্রোল ঢেলে ছয়জনের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সেই ভয়াবহতম অধ্যায়টিই নিজ চোখে দেখা ও জানা তথ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন রাজসাক্ষী আফজালুল।
তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, সকাল থেকে আন্দোলন দমনে কড়াকড়ি নির্দেশ দিচ্ছিলেন তৎকালীন ওসি এ. এফ. এম. সায়েদ। দুপুর দেড়টার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার খবর আসার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেল ৪টার দিকে বিজয় মিছিল থানার সামনে এসে পৌঁছালে ওসির নির্দেশে এএসআই বিশ্বজিৎ এবং অন্যান্য ফোর্স মিছিলে গুলি ছোড়ে। কয়েকজন সেখানেই লুটিয়ে পড়েন।
আফজালুল বলেন, গুলিবিদ্ধদের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকা অবস্থায় ওসি সায়েদ ফোনে কারও সঙ্গে পরপর কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর মরদেহগুলো প্রথমে তিন চাকার ভ্যানে, পরে একটি পিকআপে তুলে নেওয়া হয়। ওসি সায়েদ তখন এসআই আব্দুল মালেক ও এএসআই বিশ্বজিৎকে নিয়ে চোখের আড়ালে কিছু পরামর্শ করছিলেন। এতে সন্দেহ হওয়ায় তিনি সেদিনই পিস্তল নিজের কাছে রেখে সিভিল পোশাকে থানা ত্যাগ করেন।
পরদিন ভোর পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকে তিনি নিজেদের বাসায় চলে যান। এরপর ১৫ আগস্ট থানায় গিয়ে নিজের নামে ইস্যু করা অস্ত্র জমা দিতে গেলে জানতে পারেন, যাদের গুলি করে পিকআপে তোলা হয়েছিল, সেসব মরদেহ সেইদিনই ওসি সায়েদ ও বিশ্বজিৎ পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছে।
জবানবন্দিতে তিনি আরও জানান, আন্দোলনের সময় স্থানীয় এমপি সাইফুল নিয়মিত ফোনে ওসি সায়েদকে নির্দেশ দিতেন। আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে বিরোধী পক্ষকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত নানা নির্দেশনা তিনি থানা পর্যায়ে পৌঁছে দিতেন। তবে হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় তৎকালীন রেঞ্জ ডিআইজি নুরুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন এবং সার্কেল এএসপিরা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে দাবি করেন আফজালুল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া এই মামলায় চলতি বছরের মে মাসে তিনি গ্রেফতার হন। পরে বিবেকের তাড়নায় এবং শহীদ পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শহীদদের প্রতি ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে তিনি আদালতকে সত্য জানাতে চান। এজন্য শহীদ পরিবার এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনাল ২ এর বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে আসামিপক্ষ আংশিক জেরা শুরু করে। বাকি জেরা নেওয়ার জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেন আদালত।
মামলার প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হন। নিহতরা ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি ও আবুল হোসেন। একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। গুলিবিদ্ধদের মধ্যে একজন এখনও জীবিত থাকা অবস্থায়ই আগুন দেওয়া হয়েছিল বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
এই মামলায় মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। গ্রেফতার আটজনের মধ্যে সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও এসআই আফজালুল দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। অন্যদিকে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান ও কনস্টেবল মুকুল।
বিচারের অগ্রগতিতে এ সাক্ষ্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শহীদ পরিবারের কাছে সত্য উদঘাটনের এই প্রক্রিয়াকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।