মৃত্যুতেও অমলিন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৮:১০ পিএম
মৃত্যুতেও অমলিন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া
রাজু আহমেদ

জীবন সফল নাকি ব্যর্থ- তা নির্ধারিত হয় মৃত্যুর মোটিভে এবং তৎপরবর্তী কালে জীবিতদের মন্তব্যে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যে ভালবাসা ও সম্মান নিয়ে বিদায় নিলেন তা অকল্পনীয়। বাংলাদেশ তাকে মনে রাখবে। জেল-জুলুম ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েও যে মাহাত্ম্যপূর্ণ মর্যাদা অর্জন করা যায়- তা আপোশহীন দেশনেত্রী তাঁর সমালোচকদের হাতে-কলমে দেখিয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতিতে সম্মিলিতভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ মরহুমার বিদেহী আত্মার মঙ্গল কামনা করছি। পঁচিশের ত্রিশে ডিসেম্বরের ফজর বাদে রবের ডাকে দেশনেত্রী প্রত্যাবর্তন করেছেন সকলের চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে- এই খবরে মুহ্যমান গোটা জাতি। পরিবারের সদস্যদের শোক সইবার শক্তি হোক। 

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সংকটে ঢাল হয়ে আগলে রাখা মহীয়সী রাষ্ট্রের বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে বিদায় নিলেন। দল-মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধাভাজন মানুষটি গণমানুষের প্রার্থনার মাঝেই বিদায় নিলেন। দেশপ্রেমের যে বাতিঘর এক-এগারোর আমলে হয়েছিলেন তা তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পুনর্জন্ম। এই ইস্পাত-দৃঢ় মানসিকতা তাকে গণমানুষের ভালোবাসার মাধ্যমে দেশনেত্রীর পরিপূর্ণতায় পরিণত করেছে। খালেদা জিয়ার সমালোচকরাও স্বীকার করবেন, জেল-জুলুমের মাধ্যমে যে অবিচার তার সাথে করা হয়েছে তা ঘৃণ্যতর। রাজনৈতিক এই জিঘাংসার শিকার না হলেই বরং বাংলাদেশের শত্রুতা ও বন্ধুত্বের ইতিহাস পরিচ্ছন্ন থাকতো। 

একজন সফল সেনাপ্রধান ও জননন্দিত রাষ্ট্রপতির স্ত্রী কিংবা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির নক্ষত্রের মা পরিচয়ের বাইরেও বেগম খালেদা জিয়ার অনন্য পরিচয় আছে। সে পরিচয়ে তিনবারের প্রধানমন্ত্রিত্বের পালক না লাগালেও তিনি একটুও মলিন নন। বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, দেশপ্রেম এবং মানসিক দৃঢ়তা সকলের জন্যই শিক্ষণীয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সকল সংকট মোকাবিলা করে এবং শঙ্কা দূর করে সম্ভাবনা সৃষ্টিতে তার অবিচল দৃষ্টি ছিল। একাশিতে আততায়ীর হাতে জিয়াউর রহমান শাহাদত বরণের পরেও সংসার ও সন্তানের সাথে পরম মমতায় সদ্য জন্মানো বিএনপিকেও তিনি শাখা-প্রশাখায় বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। একটা সময় ধরে খালেদা জিয়া ও বিএনপি একে অন্যের পরিপূরক ছিল। দল ভাঙার শত চক্রান্তে কতজন মেতেছে অথচ খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিএনপি একমূলে বহুমুখী কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত থেকেছে। অধিকাংশই যার গণপ্রশংসা অর্জন করেছে এবং সকল কার্যক্রম জনসম্পৃক্ত হয়েছে। যারা রাজনীতি থেকে খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারকে মাইনাস করতে চেয়েছিল তারাই মানুষের মন থেকে মাইনাস হয়ে গেছে। 

নির্দিষ্ট করে বেগম খালেদা জিয়ার একটি গুণের কথা বলতেই হবে। তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতিতে কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। সারাজীবন একটি অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করেছেন কি না সন্দেহ। পদে ছোট অথচ বয়সে বড়ো- প্রত্যেকেই তাঁর থেকে প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন। অথচ এই মানুষটিকে যে সকল কথা ও অভিযোগের তীরে টার্গেট করা হয়েছিল- তা আসলে ভাষায় প্রকাশের বাইরে। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার কালে এমন কিছু চারিত্রিক অপবাদ তাকে মিডিয়ার মাধ্যমে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়েছিল যা তৎকালীন ক্ষমতাধরদের পারিবারিক শিক্ষা, পদ-পদবি ও সভ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ অপমান সয়ে সয়ে বেগম খালেদা জিয়া গণমানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গেছেন। যারা বিএনপির রাজনীতি অপছন্দ করে কিংবা কড়া সমালোচক তারাও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বের প্রশংসায় কৃপণ থাকতে পারবে না। 

বাংলাদেশে শূন্যতা বাড়ছে। দেশপ্রেমিক ওসমান হাদির পরে মহান দেশপ্রেমিক খালেদা জিয়ার প্রস্থান দেশবাসীকে নিঃসন্দেহে ব্যথিত করেছে। তবে তাদের সারাজীবনের পরিশ্রম বিফল হবে যদি বাংলাদেশপন্থা কারো রক্তচক্ষুর ভয়ে থেমে যায়। আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসন বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়া আজীবন লড়াই করেছেন। ১/১১ এর সময়ে তৎকালীন সরকারের সাথে আঁতাত করে আবারও ক্ষমতায় যেতে পারতেন কিংবা দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে তিনিও আয়েশি জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে থেকে গেছেন। নিপীড়ন-নির্যাতন মাথা পেতে বরণ করেছেন। পরবর্তী গল্পগুলো সবার জানা। বেগম জিয়ার প্রতি দেশপ্রেমিক নাগরিকদের ঋণ আছে। সবাই মিলে বাংলাদেশকে গড়ে তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে হবে। সেজন্য দরকার মতভেদ ভুলে সার্বিক ও সামগ্রিক ঐক্য। জীবনের শেষ দিনগুলোতে বেগম জিয়া সারা বাংলাদেশের ঐক্যবদ্ধতার স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সেটা ধারাবাহিক করা উচিত- দেশের কল্যাণে এবং নিজেদের মঙ্গলে।

লেখক: রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে