দেশে গুমের ঘটনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে চিহ্নিত করে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গভীর সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কমিশনের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলিয়েছে’ এবং ক্ষমতার অংশ হতে গিয়ে বারবার অপব্যবহৃত হয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে র্যাব বিলুপ্তিসহ সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
গত রোববার (৪ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে কমিশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, “দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলায়, কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়।”
কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, আগের সরকারগুলোসহ সদ্য বিদায়ী সরকারও বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করেছে। মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। মিডিয়া হাউজ দখল করাও গোয়েন্দা সংস্থার কাজ নয়। কিন্তু তাদের এভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে।” তিনি যোগ করেন, “এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল র্যাব। মোট অভিযোগের প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গে র্যাবের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এরপরেই রয়েছে পুলিশ, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হার প্রায় ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইও ব্যাপকহারে গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বহু ক্ষেত্রে সাদা পোশাকে বা প্রশাসনের লোক পরিচয়ে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “অভিযোগগুলোর ধরন থেকে স্পষ্ট যে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন অসদাচরণ নয়। এটি র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত একটি রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।” তিনি জানান, কমিশনের কাজ শুরুর পর সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংসের প্রমাণ পাওয়া গেছে র্যাবের বিরুদ্ধে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সক্রিয় বিবেচনায় রাখা হয়। এর মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের গুমের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কমিশনের সভাপতি বলেন, “তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।” তিনি জানান, মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান, বরিশালের বলেশ্বর নদী ও বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং প্লেসের সন্ধান মিলেছে, যা গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশন আরও জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য চার ধাপে কিছু অভিযোগ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পৃথকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে গুম প্রতিরোধে একাধিক সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে র্যাব বিলুপ্ত করা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ চালু করা এবং ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’গুলোকে সত্য ও স্মৃতির প্রতীক হিসেবে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশও করা হয়েছে।