দেশের খাদ্য মজুতে নতুন রেকর্ড গড়ে ২০ লাখ মেট্রিক টনের মাইলফলক অতিক্রম নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। দীর্ঘ ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত দুই কোটির ঘর ছাড়িয়েছে-যা শুধু কৃষি উৎপাদনের উন্নতি নয়, পাশাপাশি নীতিগত পরিকল্পনা ও সংগ্রহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত বহন করে। গত বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বেশি মজুত থাকা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে অধিকতর সুরক্ষিত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়-২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় খাদ্য মজুত ওঠানামা করেছে। বিশেষ করে গত বছর চালের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও চলতি বছরে তা প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল, গম ও ধান মিলিয়ে ২০২৬ সালের শুরুতে রেকর্ড পরিমাণ মজুত নিঃসন্দেহে কৃষকের উৎপাদন সাফল্য, সরকারি ক্রয়নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রভাবের ফল। খাদ্য সচিবের ভাষ্যমতে, পরিকল্পিত নীতি প্রণয়ন ও ধারাবাহিক তদারকি এ অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু বাস্তব প্রশ্নও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। খাদ্য মজুতের উচ্চ পরিমাণ যেমন সংকট মোকাবিলায় সহায়ক, তেমনি সংরক্ষণ সক্ষমতা, গুদামে আধুনিক অবকাঠামো, অপচয় ও নষ্ট হওয়া রোধ-এসব ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকলে অতিরিক্ত মজুত কখনও কখনও ক্ষতির কারণও হতে পারে। ফলে গুদাম আধুনিকায়ন, শীতাতপ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল স্টক মনিটরিং-এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মজুত যেন কৃত্রিমভাবে বাজার প্রভাবিত না করে-এদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। আমদানি, সরকারি ক্রয়মূল্য, কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্থিতিশীলতা-সব কিছুর সমন্বিত বিবেচনাই টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত বিতরণ কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সহায়তা এবং সংকটকালে দ্রুত রিলিজ নীতির প্রস্তুতি থাকা জরুরি। খাদ্য মজুতের এই সাফল্য অবশ্যই প্রশংসনীয়; তবে এটিকে কেবল পরিসংখ্যানগত অর্জন হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। উৎপাদন বৃদ্ধি ও মজুতের পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, জলবায়ু সহনশীল জাত সম্প্রসারণ, গ্রামীণ সরবরাহ চেইন উন্নয়ন-এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে খাদ্য নিরাপত্তা আরও দৃঢ় হবে। রেকর্ড মজুত আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায়-কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের টেকসই ভিত্তি গড়তে প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনমুখী খাদ্য ব্যবস্থাপনা। অর্জন ধরে রেখে এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত-নিরাপদ সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য ও স্থিতিশীল বাজারের সমন্বিত নিশ্চিতকরণ।