আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরে মব সহিংসতা বা গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ১৯৭-এ দাঁড়িয়েছে; যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে ভালুকায় গার্মেন্ট শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচিত-যেখানে পরবর্তী তদন্তে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনা শুধু আইনভঙ্গই নয়, সামাজিক অবিশ্বাস ও গুজব-নির্ভর বিচার প্রবণতার বিপজ্জনক বিস্তারকেও ইঙ্গিত করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সন্দেহ, গুজব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উগ্রতার আবহ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার রূপ নিয়েছে। এমনকি শিল্প-সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো-কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও এসব সহিংসতা রোধ করা যায়নি, কিংবা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুতর সংকেত। আসকের প্রতিবেদনে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার হারও মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্য মাত্রাগুলোকে সামনে এনেছে। কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত, মানবিক আচরণ নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিতে প্রশ্ন উঠছে; একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলে অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও বিরোধের ঘটনায় প্রাণহানি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির ঘটনাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের। তবে প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ আছে-যেমন আইন সংস্কারের কয়েকটি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক শ্রম মান অনুমোদন-যা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এই ধারা জোরদার করা জরুরি। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সিভিল সোসাইটি ও কমিউনিটি পর্যায়ে গুজব প্রতিরোধ ও নাগরিক সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। এছাড়াও কারা ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করা-মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা-গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হিসেবে-রক্ষা করতে হবে। মানবাধিকার শুধু কোনো সংগঠনের প্রতিবেদনের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা-নির্ভরতা। সহিংসতা ও অনিয়মের সংস্কৃতি অপ্রতিবাদিত থাকলে সামাজিক আস্থা ও আইনের মর্যাদাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সময়োপযোগী সংস্কার, কার্যকর প্রয়োগ এবং সবার জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা-এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।