শহুরে জীবনযাত্রায় ফাস্টফুড এখন শুধু রুচির বিষয় নয়, বরং অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। কম সময়ে সহজলভ্যতা, স্বাদের আকর্ষণ এবং জীবনযাপনের গতি-সব মিলিয়ে শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, অনেকেই নিয়মিত ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই খাবারভিত্তিক অভ্যাস শুধু সাময়িক আনন্দ নয়-দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনিসহ সমগ্র দেহের জন্য এক নীরব ঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য প্রসঙ্গে এ বিষয়টি নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে। ফাস্টফুডে উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম উপস্থিত থাকে, যা উচ্চ রক্তচাপ বাড়ানোর পাশাপাশি কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এমন চাপ কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে এসব খাবারে ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়িয়ে কিডনি ক্ষতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এখানেই থেমে নেই ঝুঁকি। ফাস্টফুডের সঙ্গে যোগ হয় চিনিযুক্ত পানীয় ও মিষ্টিজাতীয় খাবার, যা ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন প্রতিরোধ ও টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়-আর ডায়াবেটিস যে কিডনি রোগের অন্যতম বড় কারণ, তা সুপরিচিত। পাশাপাশি এসব খাবারে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিগত ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। ডিহাইড্রেশন, কিডনি পাথর ও মূত্রনালির সংক্রমণের আশঙ্কাও এ কারণেই বাড়তে পারে। নিয়মিত ফাস্টফুড গ্রহণের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্কও আজ প্রমাণিত। স্থূলতা যেমন হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি এসব রোগের প্রভাব পরোক্ষভাবে কিডনির ওপরও পড়ে। অর্থাৎ ফাস্টফুড শুধু একটি অস্বাস্থ্যকর খাবার নয়-এটি একাধিক রোগঝুঁকির সেতুবন্ধন। তবে এই আলোচনায় দায় এককভাবে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। দ্রুত নগরায়ন, কাজের চাপ, সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প খাদ্যের সীমিত প্রাপ্যতা-এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনতে হবে। প্রয়োজন যৌথ উদ্যোগ-পারিবারিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রসার, পুষ্টি-লেবেলিং ও সচেতনতা বৃদ্ধি, পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে ফাস্টফুডে লবণ, চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি। কিডনি রোগ একবার জটিল রূপ নিলে তা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র-সবক্ষেত্রেই বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে। তাই প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে বড় কৌশল। সুস্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিনিয়োগ। তাই ফাস্টফুডের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।