৩১ ডিসেম্বর চা মৌসুম শেষ হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার বিস্তৃর্ন চা শিল্পাঞ্চলজুড়ে এখন আর সেই চিরচেনা সবুজের সমারোহ নেই। দৃষ্টিসীমা জুড়ে সারি সারি চা গাছ, কিন্তু তাতে নেই কচি পাতার উজ্জ্বলতা। বরং পাতাবিহীন, ধূসর রঙের খাড়া খাড়া ডালই এখন চা-বাগানগুলোর বাস্তব চিত্র। জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার প্রায় সব চা-বাগানেই চলছে নিয়মিত প্রুনিং বা চা গাছের মাথা ছাঁটাইয়ের কাজ। বাংলাদেশের চা শিল্পে প্রুনিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত কৃষি কার্যক্রম। শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সূত্র জানায়,প্রতিবছর ডিসেম্বরে চা উৎপাদন মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই চা বাগানগুলোতে শুরু হয় লাইট প্রুনিং। এরপর জানুয়ারির মধ্যভাগে সম্পন্ন করা হয় ‘ডিপ স্কিপ’ প্রুনিং। এই সময়ে চা গাছের ওপরের অংশ ছেঁটে ফেলা হয়, যাতে গাছ নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তী মৌসুমে অধিক ফলন দিতে পারে। প্রুনিংয়ের ফলে সাময়িকভাবে চা-বাগানগুলো প্রাণহীন মনে হলেও এটি চা গাছের সুস্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। বিটিআরআই সূত্র জানায়, প্রুনিং করা চা-বাগানে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস কোনো সবুজ পাতা দেখা যায় না। শীতের শেষে মার্চ মাসে প্রথম বৃষ্টি নামার পরই চা গাছে নতুন কুঁড়ি গজাতে শুরু করে। তখন ধীরে ধীরে আবার সবুজে ঢেকে যায় পাহাড়ি টিলা আর সমতল ভূমির চা-বাগান। চা গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্চ মাসের বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই চা গাছে প্রথম ফ্লাশ বা কুঁড়ির আগমন ঘটে। এ সময় শুরু হয় প্রাথমিক পাতা চয়ন, যাকে বলা হয় টিপিং। মার্চের শেষভাগ বা এপ্রিলের শুরু থেকে পুরোদমে শুরু হয় নিয়মিত চা-পাতা চয়ন বা প্লাকিং। তখন আবার কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে চা-বাগানগুলো। কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে সারি বেঁধে পাতা তুলতে দেখা যায় চা-কন্যাদের, আর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চা কারখানাগুলোও তখন সচল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্র জানায়, দেশে সাধারণত চার ধরনের প্রুনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নির্দিষ্ট সময় ও বিভিন্ন উচ্চতায় এই প্রুনিং করা হয়ে থাকে। ডিসেম্বরে লাইট প্রুনিং এবং জানুয়ারিতে ডিপ স্কিপ প্রুনিং তার অন্যতম। বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ রাউন্ড চা-পাতা প্লাকিং করা হয়। চা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেন, প্রুনিং মূলত চা গাছের মঙ্গলের জন্যই করা হয়। এতে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, নতুন কুঁড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী মৌসুমে মানসম্মত চা উৎপাদন সম্ভব হয়। এদিকে মৌসুম শেষে চা কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও এই সময়টিকে প্রস্তুতির সময় হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। যন্ত্রপাতি সংস্কার, বাগানের পরিচর্যা ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে এই সময়ে। ফলে নতুন মৌসুম শুরু হলে যেন উৎপাদনে কোনো ঘাটতি না থাকে, সে প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয় আগেভাগেই। চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সময়মতো বৃষ্টি হলে আগামী মার্চ-এপ্রিলে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে মৌলভীবাজারের চা শিল্পাঞ্চল। ধূসর চা-বাগান তখন রূপ নেবে সবুজের সমুদ্রে, আর দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল চা আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে জাতীয় অর্থনীতিতে।