জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রেখে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রোববার (১১ জানুয়ারি) এই আবেদন করা হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে চার্জ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানি শেষে আসামিপক্ষের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন আসামিপক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করবে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামিম। পলকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী লিটন আহমেদ। জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মনজুর আলম মনজু।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সেবা প্রথমে ধীরগতির করা হয় এবং পরে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশে ও বিদেশে সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের তথ্য গোপন রাখা। অভিযোগে এ পরিকল্পনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন জুনাইদ আহমেদ পলক।
শুনানি শেষে কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামিম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সরকার পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর চালানো মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য প্রকাশ না পায়।”
তিনি আরও বলেন, “আন্দোলনকারীরা যেন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে, সেজন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর প্রমাণ হিসেবে আমরা আসামিদের নিজস্ব কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছি, যা সরকারি সংস্থা এনটিএমসি কর্তৃক রেকর্ড করা হয়েছিল।”
কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরে প্রসিকিউটর তামিম জানান, ওই রেকর্ডে দেখা যায়, জুনাইদ আহমেদ পলক তৎকালীন এক প্রভাবশালী উপদেষ্টার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত আটটি অ্যাপ চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল, কথোপকথন থেকেই তা স্পষ্ট।”
প্রসিকিউশনের দাবি, তদন্তে পাওয়া সরকারি নথি ও উপাত্তে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে, কোন কোন অ্যাপ বন্ধ করলে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হবে, তা বাছাই করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে আসামিদের সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়। একই সঙ্গে ১০ ডিসেম্বর সজীব ওয়াজেদ জয়কে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেওয়া হয়। মামলার আরেক আসামি পলক বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।