ষড়ঋতুর রঙ্গমঞ্চে এখনো আসেনি ঋতুরাজ বসন্ত। ফাগুনের মোহনায় সাজঘরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বসন্ত। কিন্তু সাতক্ষীরার প্রকৃতিতে তার আগাম বার্তা মিলেছিল মাঘের মাঝামাঝিতেই। শীতের জড়তা কাটিয়ে ফাগুনের মাতাল সমীরণে এখন জেলার দিক-দিগন্ত আম্রমুকুলের ম ম গন্ধে মুখরিত। কবির সেই চিরচেনা পঙ্ক্তি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ জনপদে- ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল...’। শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্রই আমগাছগুলো এখন সেজেছে হলুদ-সোনালি রাজকীয় সাজে। ডালে ডালে মুকুলের গুরুভার আর মৌমাছির গুঞ্জন জানান দিচ্ছে, আসছে ‘ফলের রাজা’ আমের সুদিন। বরাবরের মতো এবারও সাতক্ষীরার বাগানগুলোতে মুকুলের যে আগাম জোয়ার এসেছে, তাতে কয়েক হাজার চাষির চোখে এখন দোল খাচ্ছে সোনালি স্বপ্ন। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৫ হাজারের অধিক বাণিজ্যিক বাগানে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা যায়, ল্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ আর আম্রপালির মতো জনপ্রিয় জাতের গাছগুলো ৯৫ শতাংশই মুকুলে ঢাকা। চাষিরা এখন দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না। কেউ ব্যস্ত হুপার পোকা দমনে স্প্রে করতে, কেউবা গাছের গোড়ায় সেচ দিয়ে মুকুল ঝরা রোধে নিচ্ছেন বিশেষ যত্ন। ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে রাজশাহীর চেয়ে অন্তত ১৫-২০ দিন আগেই সাতক্ষীরার আমে পাক ধরে। বাজারে সবার আগে সাতক্ষীরার সুস্বাদু ও বিষমুক্ত আম পাওয়া যায় বলেই এর কদর দেশ ছাপিয়ে এখন বিদেশের বাজারেও। ব্যবসায়ীরা জানান, মুকুলের এই জৌলুস দেখে ইতিমধ্যেই বাইরের জেলার বেপারিরা বাগান লিজ নিতে শুরু করেছেন। তবে শঙ্কা একটাই-হঠাৎ কালবৈশাখী বা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, "আমরা চাষিদের নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দিচ্ছি যাতে পোকার আক্রমণ বা সেচের অভাবে মুকুল নষ্ট না হয়। সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে কৃষকেরা এবার বিপুল লাভবান হবেন।" প্রকৃতির এই রূপ আর চাষিদের পরিশ্রম যদি সার্থক হয়, তবে আম্রকাননের এই সুবাস কেবল ঘ্রাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা হয়ে উঠবে উপকূলীয় এই জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।