ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় সরিষার ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। উপজেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন তারা। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মৌচাষি অনিক ইসলাম জানায়, সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহে আর্থিকভাবে তারা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি বেকারত্বও দূর হচ্ছে । অন্য দিকে উপজেলা কৃষি অফিস বলছেন মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে যেমন আয় করছেন, অন্যদিকে ক্ষেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলনও বাড়ছে কৃষকদের। গত বছর ৬ হাজার ৪ শত ২৬ হেক্টর সরিষা আবাদ হয়েছিল। এবার বেড়ে ৭ হাজার ১শত ২৫ হেক্টর চাষাবাদ হয়েছে জমিতে। ২৯জানুয়ারি বৃহস্পতিবার, রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নে আগত মৌয়ালদের সাথে কথা বলে জানাযায়, সরিষা ক্ষেতের পাশে খোলা জায়গায় চাক ভরা বাক্স ফেলে রাখেন। একেকটি বাক্সে মোম দিয়ে তৈরি ছয় থেকে সাতটি মৌচাকের ফ্রেম রাখা হয়। বাক্সের ভেতর রাখা হয় একটি রানি মৌমাছি। রানি মৌমাছি থাকায় অন্য মৌমাছিরা আসতে থাকে ওই বাক্সে। প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌচাষিরা এসব মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। এতে তারা একদিকে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের দূর হচ্ছে বেকারত্ব। এসব মধু স্থানীয়ভাবে ও বোতল জাত করে দেশের সিরাজগঞ্জে বিক্রি করা হয়। মধু সংগ্রহে আসা আব্দুস সাত্তার বলেন, সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে, প্রথমে মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে বাক্স তৈরি করা হয়। বাক্সে উপরের অংশটা কালো রঙের পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। ভেতরে কাঠের তৈরি ৭টি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় এক ধরনের সিট। বাক্স গুলো সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। ভেতরে দেওয়া হয় রানি মৌঁমাছি। যাকে ঘিরে আনাগোনা করে হাজারো পুরুষ মৌমাছির দল। রানী মৌমাছির আকর্ষণে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে পুরুষ মৌমাছিরা। একটি রানি মৌঁমাছির বিপরীতে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজারের মতো পুরুষ মৌঁমাছি থাকে একেকটি বাক্সে। কয়েক দিন পরে বাক্স খুলে সিট গুলো মেসিনে দিয়ে তারপর মধু বোতল জাত করা হচ্ছে। ১২০টি বাক্সে প্রতি সপ্তাহে মধু পাওয়া যায় ৪-৫ মন। কৃষি উপ-সহকারী কর্মবর্তা সজল বলেন, মৌয়ালরা প্রতিবছর সরিষার ক্ষেতে মধু সংগ্রহ করতে আসে। মৌসুম শুরু হলেই আমরা তাদের খবর দিয়ে থাকি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কুষিবিদ সহিদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় সরিষার আবাদ বেড়েছে। চাষিরা সরিষা চাষে বেশ আগ্রহী। ১টি পৌরসভাসহ ৮টি ইউনিয়নে ৭হাজার ১'শ ২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। কৃষকরা অধিকাংশ জমিতে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) বারি-১৪, ১৭,ও ২০ বিনা-১১ এছাড়াও অনন্য সরিষা আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা সরিষা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির চাষ হলে সরিষার ফলন ১০ গুণ বেড়ে যায়। এতে সরিষার ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরিষা ক্ষেত থেকে বিনা খরচে মধু সংগ্রহও একটা লাভ জনক ব্যবসা। এরফলে একদিকে মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে যেমন লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সরিয়া ক্ষেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলনও বাড়ছে। উচ্চ ফলনশীল বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এ জাতের সরিষা মাত্র ৭৫-৮০ দিনে ঘরে তোলা যায়। প্রতি ৩৩ শতাংশ জমিতে ৮ মন ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । সরিষা কেটে ওই জমিতে আবার বোরো ধানের আবাদ করা যায়। এতে কৃষি জমির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়। আরো উন্নত জাতের মধ্যে বারি-১৪, ১৭ ও ২০ জাতের সরিষা এখানে আবাদ হচ্ছে। গতবছরের তুলনায় এবার মানুষ সরিষাতে বেশি ঝুঁকেছে। ফলে গত বছর ৬ হাজার ৪ শত ২৬ হেক্টর সরিষা আবাদ হয়েছিল। তুলনা মূলক এবার বেড়ে ৭ হাজার ১শত ২৫ হেক্টর চাষাবাদ হয়েছে।