নদী তীরে সারি সারি নৌকা আর চরাঞ্চলের শিশুদের খেলা- ক্যামেরার লেন্সে দৃশ্যটি ধারণ করেছিল কুড়িগ্রামের চিলমারীর কলেজ ছাত্র কাবিউর রহমান। এবার এটি তার জন্য নিয়ে এসেছে আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি। লন্ডনের ‘ট্রাভেল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’-এ ১৫-১৮ বছর বয়সী শাখায় রানারআপ হয়েছে। এমন বড় অর্জনে তার এলাকাবাসীও গর্বিত। বিশ্বের ১৬০ দেশের আলোকচিত্রীদের পাঠানো ২০ হাজারের বেশি ছবির মধ্য থেকে তার তোলা ছবি নির্বাচিত হয়। গত ২৫ জানুয়ারি প্রতিযোগিতার ২৩তম আসরের ফলাফল ঘোষণার দিনে তার নাম উঠে আসে রানারআপ তালিকায়। একই বয়সভিত্তিক শাখায় বিজয়ী হন রোমানিয়ার ১৫ বছর বয়সী আলোকচিত্রী মাতেই মারাচিনেয়ানু। কাবিউর রহমান রিয়াদ চিলমারী উপজেলার সবুজ পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমানের ছেলে এবং এবং বর্তমানে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক শাখার শিক্ষার্থী। কাছের মানুষদের কাছে তিনি রিয়াদ নামেই পরিচিত। স্থানীয় এনজিও প্রতিষ্ঠান মহিদেব’র অর্থ ও প্রশাসন সমন্বয়কারী কুসুম আক্তার রুনা ছেলের শুরুর দিনের কথা স্মরণ করে বলেন,‘অফিসের কাজে আমি যখন ক্যামেরা আনতাম, রিয়াদ সেটি হাতে নিয়ে নদী আর চরাঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। চোখে যা পড়ত, সেটাই ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করত। একসময় বুঝলাম, ছবি তোলা তার কেবল শখ নয়, এক ধরনের টান। তখন আর দেরি করিনি, নিজের একটি ক্যামেরা কিনে দিয়েছি।’ কাবিউরের ছবিতে বারবার ফিরে আসে চরাঞ্চলের নীরব সকাল, নদীর ধারা, নৌকা আর শ্রমজীবী মানুষদের জীবন। খেলাধুলা করা শিশুদের হাসি ও দুরন্তপনাও তার ছবির অংশ। প্রতিটি ফ্রেমে যেন ধরা পড়েছে চরাঞ্চলের সরল, কিন্তু প্রাণবন্ত জীবন। গত বছরের মার্চে ইনস্টাগ্রামে ‘ট্রাভেল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার ২০২৫’ প্রতিযোগিতার ছবি আহ্বানের বিজ্ঞাপন তার নজরে পড়ে। বয়সভিত্তিক আলাদা শাখা থাকায় এবং এন্ট্রি ফি না থাকায় কাবিউর সাহস পান অংশগ্রহণের। দেরি না করে নিজের তোলা কয়েকটি ছবি পাঠান তিনি। নভেম্বরে চূড়ান্ত তালিকায় তার ছবি জায়গা করে নেয়। ভোট গ্রহণ শেষে জানুয়ারি ২৫ তারিখে রানারআপের নাম ঘোষণা করা হয়। গত বছর রাধাবল্লভ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বর্তমানে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির মানবিক শাখায় পড়ছে কাবিউর। মায়ের সঙ্গে কুড়িগ্রামে বসবাস করছেন তিনি। চিলমারী প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম সাবু বলেন,‘কাবিউরের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি গ্রাম ও চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও যে মেধা ও সৃজনশীলতা বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিতে পারে, কাবিউর তার প্রমাণ। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল চর্চায় পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা থাকলে আরও অনেক তরুণ এমন সাফল্য অর্জন করতে পারবে।’ নিজের অর্জন নিয়ে কাবিউর বলেন,‘আমি ভালো আলোকচিত্রী হতে চাই। আমাদের এলাকার জীবন ও প্রকৃতিকে মানুষ যেভাবে দেখে না, আমি সেভাবেই তুলে ধরতে চাই। এই স্বীকৃতি আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে।’