সুন্দরবন ও সাগর উপকূলে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যু তৎপরতা। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির আতঙ্কে বাগেরহাটের শরণখোলা সংলগ্ন দুবলাচরের অন্তত ১০ হাজার জেলে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে সাগর ও সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও বন বিভাগের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলেদের ভাষ্য, গত দুই দিনে অপহৃত ২০ জেলের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। দস্যুরা অপহরণের সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। তবে মুক্তিপণ দাবির বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বুধবার দুপুরে মোবাইল ফোনে বলেন, “সুন্দরবন ও সাগরে নিরাপত্তাহীনতা চরমে। দস্যুরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অপহরণ ও নির্যাতনের ভয়ে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করে চরে অবস্থান নিচ্ছেন। মৌসুমের শেষ সময়ে এসে তাঁরা দিশেহারা-এ অবস্থায় পরিবারে কী নিয়ে ফিরবেন, সেই চিন্তায় আছেন সবাই।” স্থানীয় সূত্র জানায়, সুন্দরবনে জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে অন্তত চারটি দস্যু চক্র সক্রিয়। তারা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। টাকা দিতে না পারলে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। গত সপ্তাহে দস্যুদের হামলায় আহত চার জেলে বর্তমানে রামপাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন, “আগে প্রবাদ ছিল-‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে-‘সাগরে গেলে দস্যু’। গত ১৫ দিনে বহু জেলে অপহৃত হয়েছেন। বর্তমানে শতাধিক জেলে দস্যুদের কবজায় থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছি।” এদিকে, জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বন বিভাগের রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় বলেন, “দস্যু আতঙ্কে জেলেরা পারমিট নিতে আসছেন না। এতে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।” শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান জানান, “জেলেরা পাস না নেওয়ায় মাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।” স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। শরণখোলা বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, জেলেরা নদী ও সাগরে না যাওয়ায় মাছের সরবরাহ প্রায় বন্ধ। ফলে তাঁদের ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। তবে জেলেদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় দস্যুরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “দস্যু তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনরক্ষীরা কাজ করছেন।” বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপহৃতদের উদ্ধারে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। উপকূলীয় এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা না নিলে অর্থনীতি ও জীবিকায় আরও বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।