১০ দিনেও মুক্তি মেলেনি ২০ জেলের

সুন্দরবনে বনদস্যু দমনে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন

এফএনএস (সাবেরা ঝর্ণা; শরণখোলা, বাগেরহাট) : | প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
সুন্দরবনে বনদস্যু দমনে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন

সুন্দরবনে বনদস্যু দমনে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন চলছে। এ অভিযানে কোস্টগার্ডের সাথে নৌবাহিনী, র‌্যাব, নৌপুলিশ, পুলিশ ও বন বিভাগ অংশ নিয়েছে।গত মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয় যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন। সুন্দরবন বনদস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড। তবে, অভিযান চললেও অপহরণের দশ দিন পার হলেও এখনো মুক্তি মেলেনি ২০ জেলের। এসব জেলেরা কি অবস্থায় তারও সঠিক তথ্য জানতে পারেননি মহাজন ও তাদের পরিবার। মহাজনরা জানিয়েছেন, জিম্মি জেলেদের মুক্তিপণ হিসেবে জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দাবি করেছে বনদস্যুরা। দস্যুেদর দাবিকৃত টাকা পরিশোধ না করলে জিম্মিদের ভাগ্যে করুণ পরিনতি নেমে আসবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।এ কারনে আতঙ্কে  পড়েছেন মহাজনরা। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের আমবাড়িয়া ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় মাছ শিকারকালে ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে তুলে নিয়ে যায় জলদস্যু সুমন এবং জাহাঙ্গীর বাহিনীর শসন্ত্র দস্যুরা। অপহৃত জেলেরা পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের শুটকি উৎপাদন পল্লীর আলোরকোল ও নারকেলবাড়িয়া শুঁটকি পল্লীর জেলে। অপহৃত জেলেরা হলেন,সাধন বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, রশিদ সরদার, প্রকাশ বিশ্বাস, ইয়াসিন মোড়ল, শিমুল, রূপকুমার বিশ্বাস,হরিদাস বিশ্বাস, গোপাল বিশ্বাস, রমেশ বিশ্বাস, প্রশান্ত বিশ্বাস, শংকর বিশ্বাস, তুষার বিশ্বাস, মনিরুল ইসলাম, উজ্জল বিশ্বাস, কালিদাস বিশ্বাস, কাশেম মোড়ল, গণেশ বিশ্বাস, উত্তম বিশ্বাস ও বাটু বিশ্বাস। এদের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও আশাশুনি এলাকায়। উল্লেখ্য সূত্র জানায় গত দেড় বছরে অন্তত ১৮/২০টি বনদস্যু বাহিনীর উত্থান ঘটেছে। সুন্দরবন হয়ে ওঠে এসব দস্যু বাহিনী নিরাপদ আশ্রয় স্থল। সম্প্রতি এসব বন ও জলদস্যু বাহিনীর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে জেলে ও ব্যবসায়ীরা। উদ্বেগ দেখা দেয় বনবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে শুরু হয় যৌথ অভিযান (কম্বিং অপারেশন)। এ অভিযানে কোস্টগার্ডের সাথে রয়েছে নৌবাহিনী, র‌্যাব, নৌপুলিশ, পুলিশ ও বন বিভাগ। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড। এক সাথে ২০ জেলে অপহরণ এবং সম্প্রতি সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে জেলে অপহরণ ও নির্যাতনের মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়েচড়ে বসে প্রশসান। যে কোনোভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার ঘোষনা দেয় সরকার। একপর্যায়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রশাসনের সঙ্গে গত রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) খুলনা সার্কিট হাউসে জরুরী বৈঠক করেন সরকারের পরিবশে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কামণ্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, সম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বনদস্যুেদর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় জেলে-মহাজনরা অসহায় হয়ে পড়েন। বিষয়টি খোদ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। সরকারের নির্দেশে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে নৌবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। দস্যু নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলমান থাকবে।গত ২০ ফেব্রুয়ারি পূব সুন্দরবনের শেলা নদীর মূর্তির খাল ও তৈয়বের খাল এলাকায় কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে বাদশা শেখ নামের বনদস্যু করিম শরিফ বাহিনীর সক্রিয় সদস্যকে আগ্নেয়াস্র ও গোলাবারুদ সহ আটক করে এ সময় বনের মধ্যে বনদস্যুেদর ৫টি আস্তানা ধংস কর হয়। সুন্দরবনের দুবলরা চরের শুটকি পল্লীর মহাজন মোতাসিম ফরাজী, জাকির শেখ, আব্দুর রউফ মেম্বর ও পঙ্কজ বিশ্বাস জানান, দস্যুেদর কারণে জেলেরা সাগর ও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধুমাত্র দিনের বেলা মাছ ধরছেন জেলেরা। ২০ জেলের এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও 'সুন্দরবন রক্ষায় আমরা' সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, ৫ আগস্টে পট পরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুেদর আধিপত্য বেড়ে গেছে। সুন্দরবন সেই পূর্বের ভয়াবহ অবস্থায় ফিরেছে। বনজীবীরা বনে যেতে ভয় পড়েছে। চলমান যৌথ অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাক ঢোল পিটিয়ে দস্যু দমন করা যায় না। বর্তমানে যেভাবে যৌথ অভিযান চলছে তাতে শুধু মহড়াই মনে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে দস্যু নির্মূল করতে হলে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। এভাবে হুইসেল বাজিয়ে শুটিং করে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। পূর্বে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল সেই পদ্ধতিতে অভিযান পরিচলনা করলে সফলতা আসতে পারে। দুবলা ফিসারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবন আবারও দস্যুেদর অভয়াশ্রম পরিনত হয়ে উঠছে। এদের নির্মূল করতে না পারলে মাছের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতিনিয়ত জেলেদের অপহরণ করছে দস্যুরা। এখনো দস্যুেদর কাছে ২০ থেকে ২২জন জেলে বন্দি রয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরো বলেন, গোপনে ছদ্মবেশ ধারণ করে অভিযান পরিচালনা করলে সফলতা আসতে পারে। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে। দস্যুদমনের বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জেলে ও বনজীবীদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে