ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে নতুন রূপে সেজে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। শীতের নির্জীবতা পেরিয়ে প্রকৃতির বুকে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য, আর সেই রঙিন উৎসবের অন্যতম দূত হয়ে ফুটে ওঠে রক্তিম শিমুল ফুল। গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট, পথের ধারে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা পতিত জমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছ যেন বসন্তের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। লাল টকটকে ফুলে সেজে ওঠা এসব গাছ প্রকৃতিকে করে তোলে নয়নাভিরাম, আর মানুষকে ডেকে নেয় প্রকৃতির কাছাকাছি। শিমুল ফুল ফুটলেই বোঝা যায়-এসেছে বসন্ত। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে এই ফুলের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। শিমুলের রক্তিম রঙ যেন আনন্দ, আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে শিমুল শুধু একটি ফুল নয়, বরং ঋতু পরিবর্তনের এক জীবন্ত প্রতীক। তবে সময়ের পরিবর্তনে গ্রামবাংলার প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি এলাকায় চোখে পড়ত শিমুল গাছ, কিন্তু এখন তা অনেকটাই বিরল হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নির্বিচারে গাছ কাটার প্রবণতা ও নগরায়ণের চাপের কারণে শিমুল গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে শিমুল গাছ রোপণ ও সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রীমঙ্গল শহর, শহরতলী ও আশপাশের গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেখা মেলে শিমুল গাছের। গতকাল শহরের মৌলভীবাজার সড়কসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উঁচু গাছজুড়ে লাল ফুলের সমারোহ যেন আকাশকেও রাঙিয়ে তুলেছে। গাছের ডালে ডালে নানা প্রজাতির পাখির উড়াউড়ি আর কিচিরমিচির শব্দ পথচারীদের মুহূর্তেই থামিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউবা সেলফিতে বন্দি করছেন বসন্তের এই অপূর্ব মুহূর্ত। শিমুল গাছ মূলত পাতাঝরা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। শীতের শেষে এর পাতা ঝরে যায়, আর ফাল্গুনের শুরুতেই নতুন পাতার আগেই ফুটতে শুরু করে দৃষ্টিনন্দন ফুল। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই গাছে গাছে দেখা মেলে টকটকে লাল শিমুল ফুলের। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আগুনরাঙা ফুলে প্রকৃতি জ্বলে উঠেছে। ফাল্গুনের রক্তিম আবহ মানুষের মন-প্রাণে এনে দেয় এক অনন্য অনুভূতি-যা একই সঙ্গে নস্টালজিয়া, সৌন্দর্য ও আনন্দের মিশেল। শুধু সৌন্দর্য নয়, শিমুল গাছের রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। লোকজ চিকিৎসায় এর ছাল ঘা শুকাতে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রক্ত আমাশয় নিরাময়েও এর ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া ফোড়া বা ক্ষতস্থানে শিমুলের ছালের প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়-এমন বিশ্বাস গ্রামীণ জনপদে এখনও প্রচলিত। প্রকৃতিবিদদের মতে, শিমুল গাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ায় না; এটি পাখি ও বিভিন্ন প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই গাছ সংরক্ষণ মানে প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে বাঁচিয়ে রাখা। বসন্তের এই সময়ে শিমুল ফুল যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়-প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই লাল সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা, ভালোবাসা ও উদ্যোগ। তাহলেই আগামী প্রজন্মও উপভোগ করতে পারবে বসন্তের রঙিন বার্তা বয়ে আনা শিমুল ফুলের অপরূপ নান্দনিকতা।