দালালের খপ্পরে প্রায় অর্ধশতাধিক যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন লিবিয়ার জেলে বন্দি হয়ে জিম্মি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার এসব যুবকদের মধ্যে গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মুক্তিপন দিয়ে ১৫ জন যুবক দেশে ফিরে আসলেও বাকিদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। ইতালি পাঠানোর নামে পাচার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণসহ প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মানব পাচার চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বরিশাল মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। অতিসম্প্রতি দেশে ফিরে আসা আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট ডুমুরিয়া গ্রামের প্রতারিত যুবক মেহেদী হাসান খান, গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের মাগুরা মাদারীপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ এবং পশ্চিম সমরসিংহ গ্রামের আব্দুর রহিম সরদার বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে মামলা এজাহারভূক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামের জামাল মোল্লা, তার ইতালি প্রবাসী দুই ছেলে জাকির মোল্লা ও সাকিব মোল্লা এবং জামালের দুই শ্যালক বাবুল বেপারী ও হাবুল বেপারীকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে জামাল ও তার দুই শ্যালককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে পুলিশ। বিদেশে থাকায় জামালের দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ৪ মার্চ দিবাগত রাতে মামলার বাদিরা জানিয়েছেন, বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ও মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে জামাল মোল্লা ও তাঁর সহযোগিরা জনপ্রতি ১৬ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেয়। বিশ্বাস জোগাতে প্রায়ই ভিডিও কলে ইতালি প্রবাসী তার ছেলেদের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া হতো। এরপর গত ২৬ আগস্ট ভুক্তভোগীদের ইতালি পাঠানোর নাম করে সৌদি আরব ও মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আটকে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না দিয়ে চলতো অবর্ণনীয় নির্যাতন। পরবর্তীতে লিবিয়ার পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। ভুক্তভোগী মেহেদী হাসান জানান, লিবিয়ার কারাগারে থাকাকালীন দালালেরা তাঁর পরিবারের কাছে আট লাখ টাকা মুক্তিপন দাবি করে এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়। জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে সেই টাকা দেওয়ার পর গত ৪ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন। লিবিয়ার জেলে বন্দি যুবকদের অভিভাবকদের তথ্যমতে, গৌরনদীর জাকির মোল্লা, বগুড়ার সাজু ও কুষ্টিয়ার লিটনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বড় দালাল চক্র কয়েক জেলার ১০৮ জন যুবকের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি পাঠানোর পথে পা বাড়ায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি স্পিডবোটে করে লিবিয়া থেকে ইতালির পথে রওয়ানা হলে কোস্টগার্ড তাঁদের আটক করে। বর্তমানে ফিরে আসা ১৫ জন ব্যতিত অন্যরা এখনো দালালের জিম্মায় লিবিয়ার কারাগারে আটক রয়েছেন। গৌরনদী থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল জানিয়েছেন, দুটি মানব পাচার মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আগৈলঝাড়া থানার ওসি মো. মাসুদ খান জানিয়েছেন, মামলার তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।