একুশে বইমেলার প্রাণময় প্রাঙ্গণে যখন নতুন বইয়ের গন্ধে বাতাস ভরে ওঠে, যখন শব্দ ও স্বপ্নের মিলনে পাঠকের হৃদয়ে জন্ম নেয় নতুন ভাবনা, ঠিক সেই সময়েই প্রকাশিত হয়েছে লেখক শেখ সুজন আলী এর নতুন ভাবনা-গ্রন্থ ‘নিঃসঙ্গতা এক মিথ’। হাওলাদার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইটি মানুষের অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগ নিয়ে এক অনন্য বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক অনুসন্ধান। গ্রন্থটির গঠনও ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে প্রচলিত প্রবন্ধের কাঠামোর বদলে প্রিয় মানুষকে লেখা চিঠির আকারে সাজানো হয়েছে মোট উনিশটি প্রবন্ধ। ফলে বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয় এ যেন কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের অন্তরঙ্গ আলাপ; এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়া এক ধারাবাহিক ভাবনার যাত্রা। এই বইয়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ, কিন্তু গভীর মানুষ কি সত্যিই একা? মানুষ কি সত্যিই নিঃসঙ্গ? লেখকের মতে, জন্মের মুহুর্ত থেকেই মানুষ নানা সম্পর্কের জালে আবদ্ধ। জেনেটিক উত্তরাধিকার তাকে যুক্ত করে পূর্বপুরুষের সঙ্গে; ভাষা তাকে যুক্ত করে সমাজের সঙ্গে; সংস্কৃতি তাকে যুক্ত করে ইতিহাসের সঙ্গে। আবার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৃতি এই সবকিছু মিলেই মানুষের অস্তিত্বকে গড়ে তোলে এক বিস্তৃত সংযোগের কাঠামোর মধ্যে। মানুষ যখন নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করে, তখনও সে ভাষার মাধ্যমেই চিন্তা করে। অথচ ভাষা নিজেই একটি সামাজিক নির্মাণ অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের ফল। তাই নিঃসঙ্গতার সেই অনুভূতির মধ্যেও মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের ছাপ লুকিয়ে থাকে।
গ্রন্থটিতে লেখক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণার দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন মহাবিশ্বের মৌলিক ঐক্য। মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। শক্তি, পদার্থ এবং প্রকৃতির নিয়ম এক অবিচ্ছিন্ন সমন্বয়ের মধ্যে কাজ করে। মানবদেহও সেই মহাজাগতিক কাঠামোরই অংশ মহাবিশ্বের উপাদান দিয়েই গঠিত মানুষের শরীর। এই প্রেক্ষাপটে লেখক প্রশ্ন তোলেন যদি মানুষের শরীর ও চেতনা মহাবিশ্বেরই অংশ হয়, তবে মানুষ কীভাবে সম্পূর্ণ একা হতে পারে? গ্রন্থটির একটি উল্লেখযোগ্য আলোচ্য বিষয় হলো-“মহাবিশ্ব ও মানবদেহ : বিচ্ছিন্নতাবোধের বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক ব্যাপ্তি।” এই আলোচনায় লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, মানুষের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয় তা মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ফল। বাস্তবতার গভীরস্তরে মানুষ কখনওই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সে সম্পর্ক, চেতনা এবং মহাজাগতিক সংযোগের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। লেখকের মতে, নিঃসঙ্গতা হয়তো মানুষের একটি অনুভূতি কিন্তু সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সঠিক নয়। কারণ এই ধারণা অনেক সময় মানুষকে নিজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নানা ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। ‘নিঃসঙ্গতা এক মিথ’ বইটি তাই কেবল একটি দর্শনধর্মী আলোচনা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবার একটি আহ্বান। এখানে বিজ্ঞান, দর্শন এবং মানবিক অনুভূতির সমন্বয়ে লেখক একটি মৌলিক ধারণা তুলে ধরেছেন, মানুষ অস্তিত্বগতভাবে একা নয়। মানুষ মূলত সংযুক্ত। মহাবিশ্বের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, স্মৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষ সবসময়ই এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর সম্পর্কের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। এই উপলব্ধিই বইটির মূল বার্তা, নিঃসঙ্গতা হয়তো অনুভূতি, কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য নয়। মানুষ, শেষ পর্যন্ত, এক সংযুক্ত সত্তা।